ওরা কারো মুখাপেক্ষী নয়

আপডেট : ২৫ মে ২০১৫, ০৩:১০

ঘরে চাল নেই। বাড়িতে চুলো জ্বলছে না দুই দিন। ছেলেমেয়েগুলো সারাদিন মায়ের কাছে খাবার চায়, কান্নাকাটি করে। মা আঁঁচলে মুখ ঢেকে চোখের জল মুছেছেন। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার দুই টাকার সাহায্য পাবার আশায় ঘুরে ঘুরে পায়ের তলায় ফোসকা পড়ে গেছে। এভাবে খালি পেটে চোখের জল ঝরানোর দিন অনেক পার করেছেন, অনেক দিন উপজেলায় গিয়ে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে দাতাদের দুয়ারে বসে থেকেছেন ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বলরামপুর গ্রামের নীলিমা সরকার, বলাকান্দরের হাজরা বেগম, মোস্তবাপুরের মনোয়ার বেগম, দাপনার সোনাভান, মল্লিকপুরের জুথি আক্তারের মতো অনেকে। কিন্তু এখন সেই দৃশ্যপট বদলে গেছে। ওদের ঘরে এখন বছরের চাহিদা মিটেও বাড়তি চাল থাকে। মাঠে দো-ফসলি তিন-ফসলি জমি। সেখানে সোনার মতো ধান ফলে। হয় তরতাজা সবজির আবাদ। কারো সাহায্যের আশায় তারা আর বসে নেই। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়। বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিভাবে আসলো তাদের বদলে যাওয়া দিন? কিভাবে পাচ্ছেন তারা আরো বড় হওয়ার স্বপ্ন?

 
জুথি আক্তারের ভাষায় তাদের ভালো থাকার চাবিকাঠি হচ্ছে প্রকৃতি। প্রকৃতির কিছু উপাদানই তাদের ভালো থাকতে সাহায্য করছে। প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের চেষ্টাই বদলে দিয়েছে তাদের ভাগ্য। তারা মাঠে ধান চাষ করেন প্রাকৃতিক লাঙল বলে পরিচিত কেঁচোর সার বা ভারমি কম্পোস্ট দিয়ে। ফসলের ক্ষতিকর পোকা দমনের জন্য ব্যবহার করেন প্রাকৃতিক উপাদান। প্রকৃতির গাছপাতা দিয়েই তৈরি করেন বালাইনাশক। এর ফলে একদিকে চাষের খরচ যেমন কমেছে তেমনি রাসায়নিক সার দিয়ে করা ফসলের তুলনায় বাজারে কিছুটা বাড়তি দামও পাচ্ছেন তারা।
 
মনোয়ারা বেগম এখন এখন প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় করছেন রাসায়নিক সার বিষমুক্ত ফসল বিক্রি করে। প্রাকৃতিক কৃষি নামের একটি সংগঠনের মাধ্যমে তিনি প্রতি সপ্তাহেই ঢাকায় পাঠাচ্ছেন তার প্রাকৃতিক ফসল। মনোয়ারার দেখাদেখি তার গ্রামের অনেকেই শুরু করেছেন প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনায় চাষাবাদ। আগে থেকেই গ্রামের এসব নারী ফসলের প্রাক বপন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ফসল উত্তোলন, বীজ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে যুক্ত থেকেছেন। এখন বিপণনের কাজটাও তারাই করছেন। বিপণনের জন্য বলরামপুর গ্রামে বসিয়েছেন বাজার। গ্রামের নারীদের চাষ করা ফসলের এই বাজারটি প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে বসে। এখানে বিক্রেতা-ক্রেতা প্রায় সবাই নারী। এ বাজার থেকেও তারা প্রাকৃতিক কৃষির মাধ্যমে ঢাকার নারী ও শিশুদের জন্য পাঠান রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত ফসল।
 

নীলিমা সরকারের বাড়ির উঠানে বসা এই বাজারে ফসল বিক্রি করে অনেকেই আয় করছেন হাজার হাজার টাকা। ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত হচ্ছেন তারা। তাদের নিজের কোনো প্রয়োজনে বাড়ির পুরুষদের মুখাপেক্ষী হতে হয় না। বরং তারাই উল্টো এটা ওটা উপহার দিচ্ছেন তাদের। কিনছেন ঘর গৃহস্থালীর টুকিটাকি জিনিস। জৈব চাষাবাদ সমপ্রসারণের কাজে নিয়োজিত হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড নামের একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা এস এম শাহীন হোসেনের মতে, এই ব্যস্থাপনায় চাষাবাদ করায় এই এলাকার নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তবে তাদের দিকে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত। তার মতে, কৃষিখাতে নিয়োজিত এসব নারীর স্বীকৃতি ও ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে পারলে দেশের কৃষি উত্পাদন কাজে নারীরা আরও আগ্রহী হবে। জিডিপিতে কৃষির অবদানও বাড়বে। তাই কৃষিকাজে জড়িত নারী শ্রমিকদের মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।