জয়নুল তখন আর্ট স্কুলের একজন শিক্ষক, তার আয় সামান্য। দুর্ভিক্ষের বাজারে উন্নতমানের শিল্পসামগ্রী তখন যেমন ছিল দুর্লভ তেমনি দুর্মূল্য। সে কারণে তিনি বেছে নেন শুধু কালো কালি আর তুলি। শুকনো তুলিতে কালো চীনা কালির টানে স্কেচ করতে থাকেন অতি সাধারণ সস্তা কাগজের ওপর। ব্যবহার করেছেন কার্টিজ পেপার। এসব কাগজ ছিল ঈষত্ পীত বর্ণের। এমনকি তিনি প্যাকেজিং কাগজও ব্যবহার করেছেন। সাধারণ স্বল্পমূল্যের এসব অঙ্কন সামগ্রী ব্যবহার করে তিনি যে শিল্প সৃষ্টি করলেন তাই পরিণত হলো অমূল্য সম্পদে। এমন এক অসাধারণ শক্তিশালী অঙ্কন শৈলীর মাধ্যমে তিনি দুর্ভিক্ষের করুণ বাস্তব দৃশ্যাবলি চিত্রায়িত করলেন, যার কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত উপমহাদেশের চিত্র ঐতিহ্যে ছিল না। জয়নুলের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলো দেখার পর ‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’ শ্রীমতি সরোজিনি নাইডু মন্তব্য করেছিলেন, ‘সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও আবেগময় বর্ণনার চেয়েও তার এসব ছবির আবেদন অধিকতর।’ ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে সে বছরই কলকাতায় যে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল তাতে জয়নুল তার ‘দুর্ভিক্ষ’ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন।
তার শিল্পী হিসেবে খ্যাতি, অসাধারণ সাংগঠনিক মেধা, তত্কালীন শিল্পী সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং কতিপয় বাঙালি সরকারি কর্মকর্তার সাহায্য ইত্যাদি মিলিয়েই সম্ভব হয়েছিল ১৯৪৮ সালে এদেশের প্রথম আর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠা। তখন এর নাম ছিল ‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস’। এই ইনস্টিটিউটকে গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষরূপে। মাত্র দু’কামরার সেই ইনস্টিটিউটকে ১৯৫৬ সালের মধ্যেই তিনি এক অতি চমত্কার আধুনিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করেন।
জয়নুল আবেদিন ছিলেন মুক্তিকামী মানুষ। স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য যারা সংগ্রাম করেন তাদের সবার সাথেই একাত্মতা জানাতে উত্সাহী ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে যখন তার বয়স প্রায় ৫৬, তিনি আরব লীগের আমন্ত্রণে ছুটে যান মধ্যপ্রাচ্যের সমর ক্ষেত্রে। আল-ফাতাহ গেরিলাদের সাথে চলে যান যুদ্ধফ্রন্টে। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আঁকেন, তার সেসব ছবির প্রদর্শনী হয় একাধিক আরব দেশে। মুক্তিযোদ্ধারা তাতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেখান থেকে দেশে ফিরতে না ফিরতে এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় আঘাত হানে জয়নুলের নিজের দেশের উপকূলীয় এলাকায়। তিন লক্ষাধিক মানুষ এই ঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়। প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খান জয়নুল আবেদিন। কিন্তু বসে না থেকে একটি রিলিফ টিমের সাথে ছুটে যান দুর্যোগাক্রান্ত এলাকায়। দুঃখী জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। পরে তিনি সেখানকার মর্মস্পর্শী দৃশ্যাবলির কিছু কিছু তুলে ধরেন তার তুলিতে, কালিতে।
সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সেরে উঠতে না উঠতেই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। নিজ দেশে বন্দী জীবন কাটাতে বাধ্য হলেন জয়নুল। পালিয়ে পালিয়ে বেড়ালেন কিন্তু সর্বক্ষণই তার দুর্ভিক্ষের সময় আঁকা চিত্রমালা আঁকড়ে ধরে রাখলেন। মুক্তিযুদ্ধ জয়নুলের মনে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিজয় অর্জনের পর পরই তিনি পূর্ণোদ্যমে লেগে যান শিল্পচর্চা সংগঠনের কাজে। এবারে লোকশিল্প তার কাছে প্রাধান্য পেতে থাকে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার জয়নুল আবেদিনকে দায়িত্ব দেন বাংলাদেশের সংবিধানটির অঙ্গসজ্জার জন্য। তিনি প্রবল উত্সাহের সাথে কাজটি সমাধা করেন। তাকে সাহায্য সহযোগিতা করেন আরও কয়েকজন শিল্পী। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক সংকট তাকে অত্যন্ত ব্যথিত করে। তার কর্মচাঞ্চল্যে কিছুটা ভাটা পড়তে থাকে। তার মন খারাপ হতে থাকে। সুপুরুষ স্বাস্থ্যবান দীর্ঘদেহী জয়নুলের স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। তিনি যেন বুঝতে পেরেছিলেন, তার সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি ছুটলেন তার আজীবন লালিত স্বপ্ন ‘লোকশিল্প জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার কাজে। জয়নুল আবেদিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে লোকশিল্প জাদুঘর স্থাপিত হয়। তার ইচ্ছে ছিল এই জাদুঘরে সংরক্ষিত হবে দেশের মূল্যবান লোকশিল্প, ভবিষ্যত্ প্রজন্ম এখান থেকেই নতুন প্রেরণা পাবে। তার অসাধারণ শিল্প-প্রতিভা এবং তার মহত্ মানবিক গুণাবলির জন্য তিনি দেশে ও বিদেশে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, সরকার এবং জনগণের কাছ থেকে পেয়েছেন সম্মান। রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশে চারুকলার উন্নয়নে জয়নুল আবেদিন তার অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি পেয়েছেন ‘শিল্পাচার্য’ সম্বোধনে। এ শিরোপা তাকে উপহার দিয়েছে তারই দেশের গুণমুগ্ধ ও কৃতজ্ঞ জনগণ।
জয়নুল আবেদিনের জন্ম সাধারণ পরিবারে। তিনি জীবনযাপনও করেছেন সাধারণ বাঙালির মতোই। সরল কিন্তু আত্মবিশ্বাসী জয়নুল সমাজের শক্তিধর ব্যক্তিত্ব এবং দরিদ্র চাষি সবার সাথেই অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে মেলামেশা করতে পারতেন। তারাও তাকে আপন মানুষ মনে করতেন। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ মজলিশি মানুষ, অক্লান্ত আড্ডা দিতে পারতেন। ময়মনসিংহের আঞ্চলিকতার টান ছিল তার ভাষায়। তিনি ছিলেন যেমন আমুদে, তেমনি রসিক। তিনি ভালোবাসতেন শিশুদের, ভালোবাসতেন ভালো খাবার, বিশেষ করে গ্রামবাংলার খাবার। তিনি ছিলেন চা প্রেমিক এবং ধূমপানে আসক্ত। নিরবচ্ছিন্নভাবে সিগারেট খেতেন। এই অভ্যাসই হয়তো শেষে তার কাল হয়েছিল। তিনি প্রকৃতির সবকিছুই ভালোবাসতেন, শুধু কাক পছন্দ করতেন না। অথচ কাকের ছবিই বারবার তার হাতের তুলির পরশে কী জীবন্ত রূপ পেয়েছে। তার কাছে কাক ছিল সুযোগ সন্ধানী চালাকদের প্রতীক। দীর্ঘ ছ’মাস ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগে ১৯৭৬ সালের ২৮ মে তিনি মাত্র ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আঁকার কাজ অব্যাহত রাখেন। তার মৃত্যুর মাত্র ক’দিন আগে হাসপাতালে শুয়ে তিনি তার নিজস্ব ঢঙে শেষ ছবিটি আঁকেন—দুটো মুখ। বলিষ্ঠ মোটা রেখায়, কালো কালি আর মোম ব্যবহার করে।
