মানব পাচার

কেশবপুর-নগরকান্দার ১২ যুবকের হদিস নেই

আপডেট : ২৭ মে ২০১৫, ০০:৪৭

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মালয়েশিয়ায় যাবার নামে বাড়ি থেকে বের হয়ে তরুণ-যুবকদের নিখোঁজ হবার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সর্বশেষ যশোরের কেশবপুরে ১০ জন এবং ফরিদপুরের নগরকান্দায় ২ জন নিখোঁজ হবার খবর জানা গেছে। অন্যদিকে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ২ মানবপাচারকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 
কেশবপুর (যশোর) সংবাদদাতা জানান, যশোরের কেশবপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ১০ যুবক মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে গত ১৯ মাস ধরে নিখোঁজ আছে। এদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। ৩ মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে যশোরের মানব পাচার দমন ও প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলা দায়ের করেছেন নিখোঁজ সুজন হোসেনের পিতা কেশবপুরের সাগরদাঁড়ি গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক।
 
কেশবপুরের সাগরদাঁড়ি, কাস্তা ও মশ্বিমনগর ইউনিয়নের কিসমত চাকলা ও নোয়ালী গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে নিখোঁজদের স্বজনদের আহাজারি শোনা গেল। তারা মানব পাচারে জড়িত অশুভ চক্রের বিচারের দাবি জানাতে থাকেন। কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামের মৃত আব্দুল গণি শেখের বাড়িতে সাংবাদিকরা উপস্থিত হলে সেখানে হূদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। নিখোঁজ সুজনের পিতা আব্দুর রাজ্জাক শেখ ও কাস্তা গ্রামের নিখোঁজ হাফিজুর রহমান ওরফে আফেলের পিতা গণি শেখ সাংবাদিকদের জানান, সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের গোপসেনা গ্রামের মোহাম্মদ আলী গাজীর ছেলে চিহ্নিত মানব পাচারকারী শহিদুল ইসলাম ও ভালুকঘর গ্রামের আব্দুল মালেক সানার ছেলে আব্দুর রহমান ওরফে ক্রেপ রহমান জনপ্রতি আড়াই লাখ টাকা নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ট্রলারে তোলে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের সন্ধান মেলেনি। ছেলের সন্ধান চাইলে তারা উল্টো ধমক দেয়।
 
অপরদিকে পার্শ্ববর্তী মনিরামপুর উপজেলার কিসমত চাকলা গ্রামের আসানুর রহমান, জমির উদ্দিন গাজী, সুমন, জাহিদুল, ফারুক হোসেন, শাহ আলম, শাহারাত আলী ও নোয়ালী গ্রামের হাসাসের বাড়িতে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রবেশ করার সাথে সাথে তাদের স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। সুমনের বাবা সুলতান জানান, তার ছেলেকে কেশবপুরের ভালুকঘর গ্রামের আব্দুর রহমান ও গোপসেনা গ্রামের শহিদুল ইসলাম ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠাবে বলে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। অনেকদিন ধরে খোঁজ না পেয়ে সন্তানের খোঁজে দালালের গ্রাম ভালুকঘরে গেলে আব্দুর রহমান তাকে লাথি মেরে বের করে দেন।
 
অন্যদিকে, নিখোঁজ আসানুরের স্ত্রী কুলসুম বেগম জানান, তার স্বামীকে ফুসলিয়ে ওই দালালরা মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। দীর্ঘদিন পার হলেও স্বামীর কোন হদিস মেলেনি। নিখোঁজ জাহিদুলের মা সুফিয়া বেগম জানান, তিনিও সন্তানের সন্ধান পেতে ভালুকঘর গ্রামে গেলে আব্দুর রহমান ও শহিদুল ইসলাম তাকে গালিগালাজ করে তাড়িয়ে দেন।
 
নগরকান্দা (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের নগরকান্দায় দুই মালয়েশিয়াগামীর এক মাস যাবত্ কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনায় জড়িত দালাল চক্র গাঁ ঢাকা দিয়েছে। জানা গেছে, উপজেলার শহীদনগর ইউনিয়নের দেলবাড়িয়া গ্রামের আব্দুল আউয়াল মোল্যার পুত্র হেমায়েত হোসেন ও একই গ্রামে মৃত কাশেম খন্দকারের পুত্র জেলাল খন্দকার গত ২৫ এপ্রিল বাড়ির কাউকে না বলে  দালালদের সাথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বাড়ি থেকে চলে যায়। ১৫/১৬ দিন পর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানায় তারা মালয়েশিয়া যাচ্ছে। এরপর থেকে তাদের খোঁজ নেই। হেমায়েতের ভাই এনায়েত হোসেন জানান, লোক মারফত জানতে পেরেছি আন্দামান সাগরের লংকার চর দ্বীপে অবস্থান করছে তারা। তিনি আরো বলেন, আমাদের আশপাশের গ্রামের লোকজনই এর সাথে জড়িত।
 
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানায় দুই মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পাচার হওয়া পূর্ব মাদলা গ্রামের কবির হোসেনের বাবা  সিদ্দিক হোসেন মোল্লা এ মামলা করেন। আসামিরা হচ্ছে শৈলকুপা উপজেলার চরধলহরা গ্রামের ইউনুস আলি ও তার বাবা ওয়াজেদ আলি।
 
শৈলকুপা থানার ওসি মো. হাশেম খান জানান, দালাল ইউনুস আলি দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচারের সাথে জড়িত। পূর্ব মাদলা গ্রামের কবির হোসেন, খায়ের মোল্লা, রবিউল ইসলামকে বিমানে বৈধভাবে মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা করে নেয়। তারপর তাদের পাসপোর্টসহ ঢাকায় নিয়ে যায়। ৩ মাস তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ৪ দিন আগে কবির হোসেন মোবাইল ফোনে তার বাবাকে জানান, তারা ৪ জন ইন্দোনেশিয়ার একটি আশ্রয় শিবিরে আছেন।
 

সিদ্দিক মোল্লা জানান, তার ছেলে জানিয়েছে দালাল ইউনুস প্রতারকদের কক্সবাজার উপকূলে নিয়ে আরো অনেকের সাথে তাদের ৪ জনকে একটি ট্রলারে তুলে দেয়। প্রায় আড়াই মাস বহু লোকের সাথে তারা সাগরে ট্রলারে ভাসতে থাকে।