মানব পাচারের মূলে রোহিঙ্গা সমস্যা। রাষ্ট্র কর্তৃক নির্যাতিত রোহিঙ্গারা উপায়ান্তর না দেখে দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে মূলত সাগরপথে বিদেশের উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছে। অমানসিক নির্যাতন, অসহনীয় অত্যাচার ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কেন-সমুদ্রপথে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে রোহিঙ্গারা তার কারণ চিহ্নিত করেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, মিয়ানমার কর্তৃক নির্যাতনের চেয়ে বিদেশ পাড়ি দেয়াকে উপযুক্ত মনে করে রোহিঙ্গারা।
থাইল্যান্ডের একাধিক সূত্র ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে জানিয়েছে, রাষ্ট্রই রোহিঙ্গাদের বিপথে যাবার জন্য ‘উত্সাহিত’ করছে। এ পর্যন্ত সমুদ্রপথের ঝুঁকিপূর্ণ মরণযাত্রায় যত অবৈধ অভিবাসী বিদেশ পাড়ি দিয়েছে তার ৯৫ শতাংশই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের দেখাদেখি কিছু বাংলাদেশিও এই বিপদ যাত্রায় শামিল হয়েছে।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা আরো জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশি বেকার ও কম আয়ের কিছু মানুষ বেশি আয়ের লোভে অবৈধ অভিবাসনের পথে পা বাড়িয়েছে। যেসব নৌকায় রোহিঙ্গাদের পাচার করা হচ্ছে, সেসব নৌকায় কিছু বাংলাদেশি নেয়ার নির্দেশনা রয়েছে মিয়ানমারের নৌ-বাহিনীর। সুতরাং পরিকল্পিতভাবেই মানব পাচার ইস্যুতে বাংলাদেশের উপর বদনাম চাপানো হচ্ছে। ২০১২ সালের জুন মাসে আরাকানে এক রাখাইন মহিলাকে ধর্ষণ ও খুন করাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এরপর মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর ব্যাপক নির্যাতন শুরু করে। মিয়ানমার রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে কখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়নি। মিয়ানমারের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আরাকানে টিকতে পারেনি তারা। বাধ্য হয়ে ছেড়েছে নিজভূম। পাড়ি দিয়েছে সমুদ্র। এদের মধ্যে কিছু এসে উঠেছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায়। কিন্তু এখানে এসেও মানব পাচারকারী চক্রের হাতে পড়ে মানুষ থেকে ‘দাসপণ্যে’ পরিণত হয়েছে তারা। দেশহীন, সহায়হীন, সম্বলহীন রোহিঙ্গাদের দেশ থাকলেও নেই নাগরিকত্ব। বেঁচে থাকার তাগিদে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় রোহিঙ্গারা। এদেরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মানব পাচার সিন্ডিকেট।
শান্তি চিরকালই অধরা:কখনো শান্তিতে জীবন-যাপন করতে পারেনি রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। ইতিহাস থেকে দেখা গেছে, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত আরাকান এলাকা শত শত বছর ধরে রাখাইন রাজ্য নামে পরিচিত ছিল এবং চট্টগ্রাম অঞ্চল তার দখলে ছিল। ১৩৪০ সালে বাংলার প্রথম স্বাধীন মুসলিম সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ আরাকানীদের থেকে চট্টগ্রাম জয় করেন। ১৫৩৮ সালে আরাকানীরা আবার চট্টগ্রাম দখল করে যা ১৬৬৬ সালে মুঘল সুবেদার শায়েসা খান উদ্ধার করেন। একশ’ বছর পর ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন শুরু হয়। চট্টগ্রামও তার অন্র্ভুক্ত হয়। অপর দিকে আরাকানের অধিবাসিগণ বিভিন্ন শিবিরে বিভক্ত হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্রমান্বিতভাবে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত থাকায় রাখাইন রাজত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে আভা (মিয়ানমারের পর্ব নাম) রাজ বোদপায়া ১৭৮৪ সালে সহজে আরাকান দখল করে তাকে আশ্রিত রাজ্য করেন, কিন্তু শান্তি স্থাপন করতে পারেননি। দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে আরাকানের অপেক্ষাকৃত দুর্বল গোষ্ঠী প্রায়ই নাফ নদী পার হয়ে কক্সবাজার এলাকায় শরণার্থী হয়ে আসত এবং এখানকার অভ্যন্রীণ শাসনকার্যে সমস্যা সৃষ্টি করত। প্রথম অ্যাংলো-বর্মী যুদ্ধ (১৮২৪-২৬) শেষে সম্পাদিত ইয়াদাবো সন্ধি অনুসারে আভা রাজ ব্রিটিশদের নিকট আরাকান সমর্পণ করে। ১৮৫২ সালে দ্বিতীয় অ্যাংলো-বর্মী যুদ্ধে বৃটিশরা রেঙ্গুন হতে বেসিন পর্যন্ এবং ১৮৮৫ সালে তৃতীয় অ্যাংলো-বর্মী যুদ্ধে সমগ্র আভা দখল করে বার্মা নাম দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনভুক্ত করে।
আরাকানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হেতু উদঘাটনের নিমিত্ত সরকার ১৯৩৯ সালে জেমস ইস্টার এবং উ তিন তুত সমন্বয়ে একটি তদন্ কমিটি গঠন করে। কমিটি অনেক বিষয়ের মাঝে সীমান্ে নিরাপত্তা জোরদার করার সুপারিশ করে। ঐ সময় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় সরকার সুপারিশগুলো বিবেচনার সুযোগ পায়নি। ১৯৪২ সালে জাপান হঠাত্ বার্মা আক্রমণ করলে ব্রিটিশরা বার্মা ছেড়ে পিছু হটে বাংলায় চলে আসে। এতে প্রশাসনিক শন্যতার সৃষ্টি হয়। সেই সুযোগে আরাকানে জাতীয়তাবাদী রাখাইন এবং মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক দাঙ্গা হয়। এতে প্রায় পঁচিশ হাজার লোক নিহত হয়। দাঙ্গা থামানোর সময় সংশ্লিষ্ট ডেপুটি কমিশনার উ ঊ ক্য খাইং নিহত হন। তখন প্রায় চল্লিশ হাজার শরণার্থী টেকনাফ সীমান্ত পার হয়ে এদেশে প্রবেশ করে। জেনারেল নে উইন ১৯৬২ সালে বার্মা সমাজতান্িক কর্মসwচ দল গঠন করে আরাকানী মুসলমানদের উপর নির্যাতন শুরু করলে টেকনাফ সীমান্ে আবার শরণার্থীর বড় ধাক্কা আসে। ১৯৭৮ সালে দুই লক্ষাধিক এবং ১৯৯১-৯২ সালে আড়াই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী এদেশে এসেছে।
২০১৩ সাল থেকে
বেপরোয়া পাচার চক্র
২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি শ্রীলংকান নৌবাহিনী মাছ ধরার নৌকা থেকে ১৩৮ জনকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করলে মানব পাচারের বিষয়টি বেশ জোরেসোরেই সামনে আসে। গত বছরের অক্টোবরে থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গলে শতাধিক বাংলাদেশি নাগরিকের সন্ধান মেলে যাদের অনেকেই ছিল জীবন্ত। সর্বশেষে গত ১লা মে থাইল্যান্ডের শংখলা প্রদেশের পাটাংবেচা জঙ্গল থেকে গণকবরের সন্ধান মেলে। উদ্ধার করা হয় শত শত রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের মরদেহ। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের সাগরে একের পর এক নৌকায় হাজারো মানুষ উদ্ধার করা হয়, যারা সবাই মানব পাচারের শিকার। মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রটি আন্তর্জাতিকভাবেই বেশ শক্তিশালী। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াতে তাদের শক্ত আস্তানাও রয়েছে।