পর্যটকশূন্য বাঁশখালী ইকোপার্ক

আপডেট : ০২ জুন ২০১৫, ০০:২১

নানামুখী সংকটে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে বাঁশখালী ইকোপার্ক। পার্ক ঘিরে চলছে বহুমুখি বাণিজ্য। সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা গাছ বিক্রির পাশাপাশি ইকোপার্কের মাটি ও হ্রদের মাছ চুরি করছে প্রকাশ্যে। এতে ইকোপার্কের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। পর্যটক না থাকলেও ইকোপার্কে অবাধে বিচরণ করছে গাছচোর, মাছচোর, মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীরা। এসব কারণে গত দুই বছর ধরে ইকোপার্কের গেট ও গাড়ি পার্কিং এলাকা ইজারা দেয়া হচ্ছে না। ফলে সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব।

 
সরেজমিনে ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বাঁশখালী ইকোপার্কের ১ হাজার হেক্টর এলাকা বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে। ২০০৩ সাল থেকে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে সৃজিত ১৪’শ ২৫ হেক্টর বাগান বনবিভাগের অফিসে কাগজে-কলমে রয়েছে। বাস্তবে নেই। আগের বনায়নের বিশাল বিশাল গাছও পাহাড় থেকে উধাও হয়ে গেছে। শুধু দেখা যায় ঝোপ-ঝাড় আর কাঁটা গাছের গোড়া। কিছু কিছু জায়গায় গাছের চারা দেখা গেলেও ১০/১১ বছর বয়স্ক গাছ চোখে পড়ে না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতিদিন সুযোগ বুঝে গাছ কেটে বিক্রি করা হয়েছে। ইকোপার্কের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গাছ থেকেও ডাল কেটে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া ইকোপার্কটি বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
 
অভিযোগ রয়েছে, বাঁশখালী ইকোপার্ক সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি পার্কের জায়গায় বসতঘর নির্মাণের জন্য প্রতি ২ শতক জমি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করে বিক্রি করছেন। এভাবে অন্তত ১৭০০ অবৈধ বসতঘর ইকোপার্ক সংলগ্ন পাহাড়ে গড়ে উঠেছে। এছাড়া পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি হচ্ছে ট্রাক প্রতি ৩০০ টাকায়। অন্যদিকে পার্কের ৫ কিলোমিটার বিস্তৃত ডানের ছড়া হ্রদ থেকে প্রতি রাতে ইঞ্জিন বোট দিয়ে মাছ চুরি করা হচ্ছে। আসামিরা ধরা পড়লেও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। এসব ব্যাপারে গ্রামবাসী প্রতিবাদ করলে কিছুদিন শান্ত থাকে, পরে আবার শুরু হয় বাণিজ্য।
 
স্থানীয় শীলকূপ ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক সিকদার, জলদির ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিন, নয়ন দে ও মোক্তার আহম্মদ বলেন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ব্যাপারে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকবার বলেছি। কিন্তু তারা কিছুতেই কর্ণপাত করেন না। উল্টো বনদস্যুদের সাথে ওঠাবসা করেন।
 
স্থানীয় বনবিট কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘ইকোপার্কে কিছুই নেই, তো কিভাবে বাণিজ্য হবে। পাহাড় কাটা ও বিক্রি চলছে সব ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায়। সেখানে আমার কিছুই করার নেই। গত দুই বছর ধরে ইকোপার্কের গেট ও গাড়ি পার্কিং ইজারা হয়নি। সরকার লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এসব বিষয়ে লিখেন, আমাদের বিরুদ্ধে লিখবেন না ।’
 
বাঁশখালী ইকোপার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেঞ্জার বাদল চন্দ্র দাশ বলেন, ‘ইকোপার্কে নানা অনিয়ম থাকার কারণে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছি ইকোপার্কের দায়িত্ব পালন করব না। সে কারণে গত ১৫ দিন ধরে আমি দায়িত্ব থেকে বিরত আছি। আর আসামি ধরে ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি জেনেছি। এ ব্যাপারে আমি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
 
চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন্য প্রাণি  ও বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান মুকুল বলেন, ‘ইকোপার্কের বর্তমান চিত্রটা গত কয়েক বছরের। তবে পাহাড় বিক্রি, মাটি কাটা ও মাছ চুরিসহ বিভিন্ন অনিয়ম যদি এখন হয়ে থাকে তা তদন্ত করা হবে।’
 

প্রসঙ্গত, ১২ হাজার হেক্টর বনভূমি নিয়ে ২০০৩-২০০৪ অর্থবছরে বাঁশখালী ইকোপার্কের যাত্রা শুরু হয়। এখানে গত ২০০৬-০৭ হতে ২০১০-১১ অর্থবছর পর্যন্ত ৯ কোটি ৯৪ লাখ ৩০ হাজার টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। এখানে বিরল ও বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদের বাগানসহ মোট ১৪শ’ ২৫ হেক্টর বাগান সৃজন করা হয়েছে। ইকোপার্কের পাহাড়গুলোতে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল থাকায় একসময় এখানে হাতি, হরিণ, বানর, চিতাবাঘ, শূকর, চিতাবাঘ, রামকুকুর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি অবাধে বিচরণ করত। কিন্তু এখন এসব প্রাণি খুব একটা দেখা যায় না।