পবিত্র শবে বরাতের রাতে কুমিল্লার চান্দিনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ইউনিক পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী নৈশকোচে পেট্রোল বোমা হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে কমপক্ষে ৭ যাত্রী দগ্ধ হয়েছেন। হুড়োহুড়ি করে বাস থেকে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন আরও ৭-৮জন। গুরুতর দগ্ধ ২ যাত্রীকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের মধ্যে ৩ জন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। প্রাথমিক চিকিত্সার পর অপর ২ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে উপজেলার কাঠেরপুল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। হামলাকারীদের ধরতে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ প্রশাসন। এ ঘটনায় দেবিদ্বার উপজেলা থেকে একজনকে আটক করা হয়েছে বলে স্থানীয় একটি সূত্রে জানা গেছে। পুলিশ ও ভুক্তভোগী যাত্রী সূত্রে জানা যায়, ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি অভিমুখি নৈশ কোচটি (ঢাকা-মেট্রো-ব-১৪-৭৬৪৮) উপজেলার পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে কাঠেরপুল এলাকা অতিক্রমের সময় দুর্বৃত্তরা বাসটি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ওই বাসের দগ্ধ যাত্রী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার ও রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বনরুপা এলাকার সুনীল চন্দ্রের পুত্র সুমন চন্দ্র (৪০) জানান, তিনি বাসটির চালকের পেছনের সিটে বসে ছিলেন। রাত ১২টার দিকে হঠাত্ বাসটিতে বিকট আওয়াজ শুনতে পান। এসময় তার হাত-মুখসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে তরল দাহ্য পদার্থ পড়ে আগুন ধরে যায়। তার পাশের সিটের আরও কয়েকজন যাত্রীর শরীরেও তিনি আগুনের শিখা দেখতে পান।
আহত যাত্রীরা জানান, ঘটনার সময় বাসের অনেক যাত্রী ঘুমিয়েছিলেন। দুর্বৃত্তরা বাসটির বাম পাশ দিয়ে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। এসময় কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই দগ্ধ হন তারা। খবর পেয়ে মহাসড়কে টহলরত হাইওয়ে পুলিশসহ আশপাশ থেকে ছুটে আসা স্থানীয়রা তাদেরকে উদ্ধার করে প্রথমে মহাসড়কের পাশে বুড়িচংয়ের ইস্টার্ণ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে রাত ১টার দিকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
দগ্ধ অন্য যাত্রীরা হলেন: রাঙ্গামাটি সদরের বন্ধনা এলাকার বুদ্ধ চাকমার পুত্র খোকন চাকমা (৪৫), একই উপজেলার কালিন্দপুর এলাকার যুগেন্দ্র চন্দ্রের পুত্র অঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ (৪৮), কালিগঞ্জ গ্রামের হরিপদের পুত্র ও রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের শিক্ষক রঞ্জিত (৩৫), গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সাইদুর রহমানের পুত্র ইমরান (২৬), নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ সদর এলাকার আবু হোসেনের পুত্র জহিরুল ইসলাম (৩০) ও তার স্ত্রী লাভলী আক্তার (২১)।
নাশকতা কবলিত বাসের চালক সিরাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঢাকা থেকে রওনা করে চান্দিনার কাঠেরপুল এলাকায় আসার পর হঠাত্ গাড়িতে বিকট আওয়াজ হয় এবং আগুন জ্বলতে শুরু করে। আমি তাত্ক্ষণিক গাড়িটি থামিয়ে দেই। পরে হেলপারদের সহযোগিতায় আগুন নিভিয়ে ফেলি।’
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. মির্জা তাইয়েবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, দগ্ধদের মধ্যে গুরুতর আহত অঞ্জন চন্দ্র দেবনাথের বুক ও দুই হাতের ২৫ শতাংশ এবং রঞ্জিতের মুখ-বুক, দুই হাত ও পিঠের ৪০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাদেরকে বুধবার ভোরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়া কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন সুমন চন্দ্রের দুই হাত ও মুখের ১৫ শতাংশ, খোকন চাকমার মুখ ও ডান হাতের ১৮ শতাংশ এবং ইমরানের মুখ ও দুই হাতের ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। শরীরের ২ ও ৩ শতাংশ পুড়ে যাওয়া লাভলী ও জহিরুল ইসলামকে প্রাথমিক চিকিত্সা দেয়া হয়েছে।
তদন্ত কমিটি: কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল জানান, এ ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গোলামুর রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া হামলার ঘটনায় কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর হোসেনকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট পৃথক আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আর্থিক সহায়তা: জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুরুতর দগ্ধ ৫ জনকে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। গতকাল সকালে কুমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহকারি রেজিস্ট্রারের কক্ষে জেলার আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন আহতদের স্বজনদের হাতে এ টাকা তুলে দেন। এর মধ্যে গুরুতর আহত অঞ্জন ও রঞ্জিতের চিকিত্সার জন্য ১৫ হাজার টাকা এবং আহত সুমন চন্দ্র, খোকন চাকমা ও ইমরানের চিকিত্সার জন্য ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হয়েছে।
যৌথ অভিযান: কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. শাহ্ আবিদ হোসেন গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, দুর্বৃত্তরা বাসটিতে পর পর ২টি পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করতে পুলিশ, র্যাবসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা যৌথ অভিযান শুরু করেছে।
এদিকে এই হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে জামায়াত নেতা মাওলানা রফিকুল ইসলামকে (৪২) আটক করেছে পুলিশ। বিকেলে দেবিদ্বার উপজেলার বরকামতা গ্রাম থেকে তাকে আটক করা হয়। তবে মামলার তদন্তের স্বার্থে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার আটকের বিষয়টি স্বীকার করেননি।
প্রসঙ্গত, এর আগে ২০ দলীয় জোটের লাগাতার অবরোধ চলাকালে গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে জেলার চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুরে বাসে দুর্বৃত্তদের পেট্রোল বোমা হামলায় ৮ যাত্রী মারা যান।
