ট্রলারে চেপে সমুদ্রের ঢেউ পাড়ি দিয়ে এগিয়ে চলছি সোনাদিয়া দ্বীপের দিকে। স্পিডবোডে এগিয়ে চলার সময় কক্সবাজার বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামার দৃশ্য চোখে পড়ে। গভীর সাগর থেকে উপকূলের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ ধরার ট্রলার ছুটে আসছে একের পর এক। পানির ওপরে ঝাঁকে ঝাঁকে রূপালি বাটা মাছ ওড়ার অপরূপ দৃশ্য সোনাদিয়া চ্যানেল ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যায় না। এরপরের দৃশ্যটা আরো বেশি মনোমুগ্ধকর। সামনে এগোচ্ছিলাম চারপাশের ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। অনেকটা মিনি সুন্দরবন বলা যায়। পানির মধ্যে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম সোনাদিয়া দ্বীপ।
স্পিডবোড বেঁধে হাঁটা শুরু করলাম সি বিচের উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম সোনাদিয়া দ্বীপের সি বিচে। সৌন্দর্যে মন ভরে গেল, কিন্তু দ্রুত রওনা দিতে হবে! না হয় ভাটা পড়ে যাবে। তাহলে স্পিডবোডে যাওয়া যাবে না।
এই দ্বীপের অবস্থান সেন্টমার্টিনের মতো হলেও এখানে তেমন জনবসতি গড়ে ওঠেনি। মূলত জেলে ও লবন চাষিরা এই দ্বীপে বসবাস করেন। এখানে কোনো হাট-বাজার নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাজার-সদাইয়ের জন্য একমাত্র ভরসা ছোট ছোট মুদির দোকানগুলো। এই দ্বীপের যে বিষয়টি পর্যটকদের মনে সারাজীবন স্থান করে নিতে সক্ষম সেটি হলো এখানকার চা। অত্যন্ত সাধারণ মানের হলেও এখানকার চায়ের স্বাদটা অন্যরকম!
দ্বীপটির পশ্চিম দিকের শেষপ্রান্ত বেশ খোলামেলা। এই স্থানটিতে কোনো জনবসতি নেই। সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়ানো খোলা মাঠ, নির্জনতা ও অফুরন্ত বাতাস সব মিলিয়ে মন প্রশান্তিতে ভরে যায়। এই দ্বীপের মাঠে বসলে মনে হবে যেন অজানা-অচেনা কোনো দ্বীপে আপনি একা। আপনার পাশে কেউ বসে থাকলেও মনে হবে আপনি একা, চারপাশে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি। সবকিছুই মনে হবে কল্পদৃশ্যের মতো। অনেকের মতে, সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চেয়ে সোনাদিয়া দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেক এগিয়ে।
ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় বনের সমন্বয়ে গঠিত এই সুন্দর দ্বীপটি। সাগরের গাঢ় নীল জল, লাল কাঁকড়া, কেয়া বন, সামুদ্রিক পাখি সব মিলিয়ে এক ধরনের রোমাঞ্চকর পরিবেশ সবসময় বিরাজ করে এই দ্বীপে। এ দ্বীপের পানি এতটাই স্বচ্ছ ও টলটলে যে, দেখে মনে হবে যেন কোনো কাঁচের ওপর দিয়ে নৌযানটি এগিয়ে চলেছে। যা দেখলে শতবছরের দুঃখ-কষ্ট এক নিমিষেই ভুলে যেতে বাধ্য। সমুদ্র থেকে সৃষ্টি হয়ে ভেতরের দিকে গিয়ে নদীটি কয়েকটি শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে সম্ভবত। দু-পাশে সবুজ বন। এসব বনে রয়েছে কেওড়া, হারগোজা, উড়িঘাস এবং কালো ও সাদা বৃক্ষ।
সোনাদিয়া থেকে মহেশখালী দ্বীপ যেতে পথের সবকিছুও যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো এক অকৃত্রিম ছবি! মহেশখালী থেকে সোনাদিয়াকে আলাদা করে রেখেছে একটি নদী ‘বহদ্দারকাটা’। ট্রলার মালিকদের স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘বহদ্দার’। জনশ্রুত আছে, কোনো এক সময় এই নদীতে জলদস্যুরা এক বহদ্দারকে কেটে হত্যা করেছিল। সেই থেকে নদীর নাম বহদ্দারকাটা। এই নদীর দুই তীরে সৃজিত সবুজ প্যারাবনের সারি যেন মন ছুঁয়ে যায়।
মহেশখালী নেমে অটোরিকশা রিজার্ভ করে দু-পাশে ম্যানগ্রোভ বন রেখে জেটি ধরে এগিয়ে চলছি আদিনাথ মন্দিরে। পথে যেতেই চোখ পড়ল পানের বরজে। সারিবদ্ধভাবে পান সাজিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। বড় বড় নানা বুদ্ধমূর্তিতে বার্মা ভাষায় বিবরণ লেখা। আদিনাথ মন্দির থেকে বেরিয়ে সরাসরি চলে গেলাম স্বর্ণমূর্তি দেখতে। তারপর আদিনাথ বিখ্যাত মন্দিরে চলে গেলাম। পাহাড় বেয়ে চলে গেলাম মৈনাক পাহাড়ে। লোকমুখে শোনা পাঁচশ’ থেকে ছয়শ’ বছরের পুরোনো মন্দিরের কারুকার্য সুন্দর। মৈনাক পাহাড় থেকে ম্যানগ্রোভ বন, সমুদ্র এবং পুরো মহেশখালী দেখতে পাওয়া যায়। পাহাড়ের ঢালে পানের চাষ দেখা যায়।
মন্দির থেকে নেমে পাশে আরেকটি জেটি ধরে সমুদ্রের কাছে চলে যেতে পারবেন। কেওড়া, গোলপাতাসহ সুন্দরী গাছের মনোরম দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। ছবি তোলার জন্য এটি উত্তম জায়গা! সেখান থেকে ফিরে আসার সময় লবণ চাষাবাদ করার জায়গা আর শুঁটকি পল্লীতেও ঘুরে আসবেন। আসার সময় মহেশখালীর মিষ্টি পান নিয়ে আসতে ভুলবেন না। স্পিডবোডে আসবেন। আসার সময় অনেকটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ঝুলিতে ভরতে পারবেন।
