প্রস্তাবিত অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো বাতিল করে পুনঃনির্ধারণ এবং দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ঘোষণার দাবিতে দেশের ৩৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছেন শিক্ষকরা। চলতি মাসের মধ্যে শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর বিষয়ে ঘোষণা না এলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণাও দিয়েছেন তারা।
গতকাল সোমবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের ডাকে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচির কেন্দ্রীয় আয়োজনের অংশ হিসেবে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে অবস্থান ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়।
অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ৩ ও ৪-এ নির্ধারণ করা হয়। সপ্তম বেতন কাঠামোতে শিক্ষকরা গ্রেড ১ ও ২ হিসেবে বেতন পেতেন। সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপকরা গ্রেড-১ বেতন পেতেন। কিন্তু গত মে মাসে ঘোষিত বেতন কাঠামোতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেড ৩ ও ৪ ভুক্ত করা হয়েছে। সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপকরা আগে ১নং গ্রেড পেলেও নতুন বেতন কাঠামোতে তাদেরকে ৩ নম্বর গ্রেডভুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষকদেরও গ্রেড অবনমন হয়েছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো গঠনের দাবিতে সম্প্র্রতি ঢাকা, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, জগন্নাথসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বট তলার কর্মসূচিতে শিক্ষক নেতারা বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে তাদের ইশতেহারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো করার কথা বলেছিল। কিন্তু আজও পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। প্রস্তাবিত ৮ম বেতন স্কেলে শিক্ষকদের বেতন প্রথম গ্রেড থেকে ৩য় ও ৪র্থ গ্রেডে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই আমরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছি। কেননা এ সিদ্ধান্ত শুধু অর্থের সাথে সম্পৃক্ত নয়, এটি সম্মানেরও ব্যাপার। গ্রেড অবনমন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অপমানিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক নাজমা শাহীন, অধ্যাপক আব্দুল আজিজ, অধ্যাপক আজিজুর রহমান, অধ্যাপক ফেরদৌস হোসেন, অধ্যাপক আকতার হোসেন খান, অধ্যাপক মোঃ রহমত উল্লাহ, অধ্যাপক নিজামুল হক ভুঁইয়া, অধ্যাপক সফিউল আলম ভুঁইয়া প্রমুখ।
অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রস্তাবিত ৮ম বেতন স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মানসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই আমরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছি। এই কর্মসূচি সরকার বিরোধী কোন কর্মসূচি নয়, কিংবা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনও নয়। এই কর্মসূচি শুধু শিক্ষকদের ন্যায্য সম্মান ও স্বতন্ত্র বেতন স্কেল আদায়ের জন্য। চলতি মাসের মধ্যে শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়নের জন্য ঘোষণা দিতে হবে। নইলে আমাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পরবর্তীতে যেকোন কঠোর কিংবা লাগাতার কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হব।
তিনি জানান, শিক্ষকদের যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। আগামী ২০ তারিখ জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের অনুরূপ বেতন কাঠামো ঘোষণার জন্য প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হবে।
ড. নাজমা শাহীন বলেন, সকল বৈষম্য দূরীকরণপূর্বক সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপকদের বেতন-ভাতা সিনিয়র সচিবের সমতুল্য করা, অধ্যাপকদের বেতন-ভাতা পদায়িত সচিবের সমতুল্য করতে হবে। সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকদের বেতন কাঠামো ক্রমানুসারে নির্ধারণ করাসহ শিক্ষকদের যৌক্তিক বেতন স্কেল ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন আর এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। শিক্ষার মান নিশ্চিত ও উন্নত করার জন্যই শিক্ষকদের যৌক্তিক ও সম্মানজনক বেতন দেয়া প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, জগন্নাথ ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষকরা।
