মাত্র দেড় ঘন্টার ভারি বৃষ্টিতে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে নিমজ্জিত হয়। ভারি বর্ষণ, জমে থাকা পানি এবং সেই সাথে সিডিএ এভিনিউসহ নগরীর ব্যস্ততম এলাকায় শতশত যানবাহন আটকা পড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হলে নগরীর জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার এই অচলাবস্থায় নগরবাসীকে পোহাতে হয় অশেষ দুর্ভোগ।
বর্ষণ শুরু হওয়ার মুহূর্তে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা শেষ হলে ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের পড়তে হয় আকস্মিক বিড়ম্বনায়। বিভিন্ন স্থানে অভিভাবকদের তাদের শিশুদের কোলে-কাঁধে করে বৃষ্টির পানিতে ডুবে যাওয়া সড়ক পার হতে দেখা গেছে। রিক্সা, অটোরিক্সা এবং গণপরিবহনগুলো বিভিন্ন স্থানে যানজটে আটকা পড়ায় জনসাধারণকে পায়ে হেঁটে বৃষ্টিতে ভিজে গন্তব্যে যেতে হয়েছে। এদিকে গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস চট্টগ্রামে ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে চট্টগ্রামের আকাশ কালো মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে হঠাত্ করেই ভারী বর্ষণ শুরু হয়। বৃষ্টির পানি কিছুক্ষণের মধ্যেই নালা-নর্দমা উপচে নিমজ্জিত করতে থাকে নগরীর নিচু এলাকাগুলো। বৃষ্টিতে পতেঙ্গার ফ্লোটিলা জেটি সড়ক থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত, আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ এলাকা, পাঠানটুলী খান সাহেব স্কুল এলাকা, আগ্রাবাদ, হাজীপাড়া, রাঙ্গীপাড়া, মিস্ত্রীপাড়া, এক্সেস রোড, সিডিএ আবাসিকসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এসব এলাকার কোনো কোনো স্থান হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে নিমজ্জিত হয়। এছাড়া নগরীর মোহাম্মদ আলী সড়ক, মেহেদীবাগ এলাকা, চান্দগাঁও, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, খতিবের হাট, চকবাজার, বাদুরতলা, বাকলিয়া, নাসিরাবাদ ২ নম্বর গেইট, কাতালগঞ্জ, চাক্তাই ইত্যাদি এলাকাও বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত হয়। হালিশহরের বিভিন্ন ব্লকের রাস্তাঘাট বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বিভিন্ন দোকানপাট ও নিচু এলাকার ঘরবাড়ি, প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে।
ভারি বর্ষণ চলাকালে বহদ্দারহাট থেকে চান্দগাঁও, হাজী রোড, মাইলের মাথা, বাদুরতলা অভিমুখে এবং মুরাদপুর থেকে ওয়াসা মোড়, প্রবর্তক মোড়, চকবাজার ইত্যাদি এলাকায় শ্বাসরুদ্ধকর যানজটের সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও পানিতে ডুবে সিএনজি চালিত অটোরিক্সা, প্রাইভেট কার ও বিভিন্ন গণপরিবহন অচল হয়ে পড়লে জনভোগান্তি তীব্র আকার ধারণ করে। বিভিন্ন স্থানে স্তূপীকৃত নগরীর দৈনন্দিন বর্জ্যও বৃষ্টির পানিতে ভেসে নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
পাহাড়ি ঢলে দুর্ভোগ:ঝিনাইগাতী (শেরপুর) সংবাদদাতা জানান, গত দু’দিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে বিভিন্ন গ্রামের শত শত মানুষ। পানির তোড়ে মহারশি নদী’র রামেরকুড়া, দিঘীরপাড় ও বনগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে আবাদি জমিতে বালুর স্তর পড়েছে। সোমেশ্বরী নদীর পানির তোড়ে ধানশাইল-কুচনিপাড়া সড়কের বাগেরভিটা এলাকায় ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য পুকুর, শাক-সবজির বাগান ও কৃষকদের বীজতলা।
বিশ্বনাথ (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, গত দুই দিনের অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গত বুধবার রাতভর টানা বৃষ্টিপাতের ফলে উপজেলা সদরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে সরকারি কোয়ার্টার ও বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। ভোগান্তি পোহাতে হয় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের।
পানিবন্দী কয়েক হাজার পরিবার:রংপুর প্রতিনিধি জানান, অব্যাহত ভারি বর্ষণে রংপুর নগরীর ৩৩ ওয়ার্ডের কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। বুধবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত রংপুরে প্রায় ১২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জেলা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে। এদিকে অব্যাহত বৃষ্টিপাতের ফলে তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রংপুরের কাউনিয়া, গঙ্গাচড়া ও পীরগাছা উপজেলার চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ে। ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে চর চিলাখাল এলাকায়। গত ২৪ ঘণ্টায় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এই এলাকার প্রায় ১০টি পরিবারের ঘরবাড়ি।
ঘূর্ণিঝড়: সেনবাগ (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার দুুুপুরে উপজেলার উপর দিয়ে প্রচণ্ড বেগে ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। এতে অসংখ্য গাছপালা উপচে পড়ে। গাছ পড়ে বিভিন্ন স্থানে পল্লী বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে যায়। এতে দুপুরের পর থেকে পুরো সেনবাগ উপজেলায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
বজ্রপাতে গৃহবধূ নিহত: উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, গত দু’দিনে অবিরাম বৃষ্টিপাতে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদে সামান্য পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় ১ গৃহবধূ নিহত ও এক নারীসহ ৮ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে।
