ব্যর্থতার গর্ভে সাফল্যের ভবিষ্যত্

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৯, ২১:৪৮

বলা হইতেছে—মাঝপথেই ভেস্তে গিয়াছে পহেলা মার্চে হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত কিম-ট্রাম্প বৈঠক। নূতন চুক্তি হইবার কথা ছিল। হয় নাই। মোটা দাগে এই বৈঠককে বিশ্বমিডিয়া বড় করিয়া ‘ব্যর্থতার’ তকমা দাগাইয়া দেওয়ার পক্ষে। কিন্তু চারিদিকে ব্যর্থতার এত এত আওয়াজের পরও উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উনের প্রতি মুগ্ধতা কাটিতেছে না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ট্রাম্প এখনো পুরোপুরি আস্থা রাখিতে চাহেন কিমের উপরই। তিনি বলিয়াছেন, ‘দেখা যাক কী হয়! আমাদের দুইজনের সম্পর্ক খুব ভালো। পরস্পরকে ভালোবাসি। আশা করি, সুফল মিলিবে।’ তাত্পর্যপূর্ণভাবে কিম আমেরিকার সহিত চুক্তির ভবিষ্যত্ লইয়া বলিয়াছেন যে, ‘এত তাড়াতাড়ি বলিতে পারিব না, কিন্তু আমি আশাবাদী।’ কিম কি আদৌ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে ইচ্ছুক? এমন প্রশ্নের উত্তরে কিম স্পষ্ট করিয়াই বলিয়াছেন যে, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে ইচ্ছুক না হইলে তিনি এই বৈঠকে আসিতেন না।

প্রথম দফার আধা ঘণ্টার বৈঠকের পর একসঙ্গে কিছুক্ষণ হাঁটিয়াছেন দুই রাষ্ট্রনায়ক। অনেকের মনে প্রশ্ন উঠিয়াছে—আর কতটা পথ হাঁটিলে দুইজনে ‘বন্ধু’ হইবেন? ট্রাম্প অবশ্য কিম-কে ‘বন্ধু’ই মনে করেন। কিমও মনে করেন, ট্রাম্প অত্যন্ত বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক। অথচ এই দুইটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন বহুদিন ধরিয়াই খুব ভয়ঙ্কর পর্যায়ে স্থিত ছিল। নিকট ইতিহাসের দিকে তাকাইলে দেখা যায়, বিশ্ব পরাশক্তিদের নিকট ভয়ঙ্কর ভেন্যু হইয়া উঠিয়াছিল উত্তর কোরিয়া। অবিভক্ত কোরিয়া মূলত জাপানিদের দখলে ছিল। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানিরা পরাজিত হইবার পর অবিভক্ত কোরিয়া ভাগ হইয়া যায় উত্তর ও দক্ষিণ ভাগে। উত্তর কোরিয়া ১৯৫০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতাদর্শে সমাজতান্ত্রিক ব্লকে চলিয়া যায়, অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া আমেরিকার মতাদর্শে যোগদান করে। আমরা দেখিতে পাই, উত্তর কোরিয়ার বর্তমান ঔদ্ধত্যের নেপথ্যে রহিয়াছে পরাশক্তিদের পূর্বাপর চোখ রাঙানি। সেই রাঙানির দুর্বিষহ অভিঘাতে নিজের সাধ্যমতো পাল্টা প্রতিরোধী ব্যবস্থার জন্য মরিয়া ছিল উত্তর কোরিয়া। ইতঃপূর্বে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়া পরস্পরকে পিষিয়া মারিবার হুমকি দিয়াছে, মানচিত্র হইতে মুছিয়া দেওয়ার হুঙ্কার ছাড়িয়াছে। এই সকল হুমকি-ধামকি সত্ত্বেও গত বত্সর জুনে সিঙ্গাপুরে ঐতিহাসিক বৈঠকে সামিল হন কিম জং উন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এই ধরনের শীর্ষপর্যায়ের অত্যন্ত স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক চুক্তি কখনো রাতারাতি সম্ভবপর হয় না। সুতরাং যাহারা এই বৈঠককে ‘শূন্য’ আখ্যায়িত করিতেছেন, তাহারা সম্ভবত ইহা অনুধাবন করিতে পারিতেছেন না যে, আলোচনার টেবিলে সাফল্যের ব্যারোমিটার নিরন্তর ওঠানামা করে এবং তাহা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াও বটে। হ্যানয়ের বৈঠকের পর আপাতত যেই রকম চলিতেছিল সেই রকমই চলিবে। উত্তর কোরিয়া নিজেদের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ রাখিবে, পরিবর্তে দক্ষিণ কোরিয়ার সহিত যৌথ সামরিক মহড়া বন্ধ রাখিবে আমেরিকা। তবে আমরা আবারও বলিতে চাই, সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়া অন্যের দেশে নাক গলাইবার নীতি যতদিন এইভাবে বহাল থাকিবে, ততদিন শান্তি আসিবে না এই বিশ্বে।