প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে বলেছেন- ‘শিক্ষার জন্য আমরা যা খরচ করি, সেটাকে আমি কখনোই খরচ হিসেবে মনে করি না। এটাকে আমি বিনিয়োগ মনে করি, ভবিষ্যতে দেশ গড়ার জন্য শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষ নির্মাণের জন্য বিনিয়োগ। এ কারণে যারা শিক্ষা দেবেন ও শিক্ষা গ্রহণ করবে, তারাও যেনো নিজেকে সেভাবেই গড়ে তোলেন। শিক্ষার উত্কর্ষতার জন্য প্রয়োজন গবেষণা। শিক্ষার সাথে গবেষণাও এখন বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। এই বিনিয়োগের পরিমাণ আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে আসার শর্তে শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ‘প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ ২০১৯’ ঘোষণা করেছে যার আওতায় সরকার থেকে মাস্টার্সের জন্য ৬০ লাখ টাকা ও পিএইচডির জন্য ২ কোটি টাকা দেওয়া হবে। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কারণ এর মাধ্যমে দুটি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। এর একটি হলো গবেষণামুখী জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে উদ্ভাবনকে অনুপ্রাণিত করা। আরেকটি হলো যারা বাইরে গিয়ে গবেষণা করবে তাদের দেশে ফিরে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। এর মাধ্যমে দেশপ্রেমের মনোভাব গবেষকদের মধ্যে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি, যুগোস্লাভিয়া সফরের সময় তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে শিক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির আওতায় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের উন্নয়নের বিষয়টিকে দীর্ঘমেয়াদে বিবেচনা করে এ দেশের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পাঠিয়েছেন। পরবর্তীতে তারা গবেষণা শেষ করে দেশের উন্নয়নে নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছেন। এই ধরনের ইতিবাচক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার কারণে তারা দেশ-বিমুখ হননি বরং দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছেন। একই ধারা ‘প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ ২০১৯’ যারা পাবেন তাদের ক্ষেত্রেও যেন বজায় থাকে সেই বিষয়টিতে জোর দিতে হবে। এটি হলো বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার বিষয়। তবে দেশেও এ ধরনের উচ্চশিক্ষার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষার্থীদের ফুলটাইম পিএইচডি ও মাস্টার্সের জন্য স্কলারশীপের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
বর্তমানে দেশে পিএইচডি ও মাস্টার্সের স্কলারশীপের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ আছে তা যথেষ্ট নয়। আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থী দেশের মধ্যে থেকেই গবেষণার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে চায়। তাদের মধ্যে বিশ্বমানের গবেষণা করার আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু বর্তমানে ফুলটাইম পিএইচডি ও মাস্টার্স গবেষণার জন্য মাসিক প্রতিজনের জন্য ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা স্কলারশীপের বরাদ্দ থাকে। এটিও আবার বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী আবেদন করে পায় না। আবার আর্থিক বিবেচনায় এই টাকার অংকটি প্রয়োজনের তুলনায় কম। কিন্তু দেশের মধ্যে উচ্চতর গবেষণাকে প্রাধান্য দিতে হলে গবেষণাকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের বাইরে গবেষণা খাতে পৃথকভাবে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি একজন শিক্ষার্থীকে ২৫ বা ৩০ হাজার টাকার পরিবর্তে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার স্কলারশীপ প্রদানের পরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণীত হয় তবে আমাদের দেশের মধ্য থেকেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের পিএইচডি বা উচ্চতর গবেষণাগুলোতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সার্বক্ষণিক মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী পেয়ে নিজেদের বিশ্বমানের মৌলিক গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হবে। এতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিদেশ নির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। আবার এভাবে দেশের মধ্যে গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় গবেষণা নীতিমালা প্রণীত হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানে জায়গা করে নিতে পারবে। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে কলাবোরেশনের মাধ্যমেও আমরা গবেষণাকে এগিয়ে নিতে পারি।
মালয়েশিয়াতে পিএইচডি বা মাস্টার্স থেকে একটি গবেষণার ফলাফল বিশ্বমানের জার্নালে প্রকাশিত হলে শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকদের উত্সাহিত করার জন্য প্রায় ১১-১৫ হাজার রিংগিত সম্মানী প্রদান করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও এ ধরনের প্রণোদনামূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করে শিক্ষকদের গবেষণার মানসিকতা গড়ে তোলা যেতে পারে। গবেষণাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এই ধরনের গবেষণা কেন্দ্রকে বহুমাত্রিক গবেষণা চর্চার তীর্থস্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গবেষণাকে আমাদের এমন একটি পরিকল্পনা অনুযায়ী সাজাতে হবে যাতে করে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আমাদের দেশে শিক্ষার্থীরা গবেষণা করতে আসে। আমাদের দেশে এখন যারা গবেষণা করছে তাদের অধিকাংশই গবেষণার পাশাপাশি চাকরি করছে। ফলে একদিকে চাকরির চাপ আর অন্যদিকে গবেষণা একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার আমাদের দেশে একজন শিক্ষার্থী স্কলারশীপ পেয়ে সার্বক্ষণিকভাবে গবেষণা কাজে যুক্ত থাকলেও পিএইচডি’র পরে তার চাকরির সুযোগ থাকছে না। কারণ চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে- আপনি ওভার কোয়ালিফাইড। এজন্য স্কলারশিপ প্রদানের পাশাপাশি পিএইচডি শেষে একজন গবেষকের চাকরির নিশ্চয়তা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করে যারা যে বিষয়ের উপর পিএইচডি করেছে তাদের সেই ধরনের চাকরিতে নিয়োগ করতে হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি বাড়ানোর জন্য তাদের পিএইচডি ও মাস্টার্সের জন্য বিধিবদ্ধভাবে ছুটি প্রদান করে গবেষণায় উত্সাহিত করতে হবে। শিক্ষকদের কনসালটেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার স্বার্থের সাথে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রজেক্ট লেখার বিষয়ে শিক্ষকদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। এই প্রজেক্টের অর্থায়ন থেকে একজন শিক্ষার্থীর পিএইচডি ও মাস্টার্সের স্কলারশিপের বিষয়টি নিশ্চিত করা যেতে পারে। আবার আমাদের দেশের যে শিল্প-কারখানাগুলো রয়েছে তাদেরও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এবং নিজেদের প্রযুক্তির উত্কর্ষতার জন্য পিএইচডি ও মাস্টার্স প্রোগ্রামে স্কলারশিপ প্রদানের বিষয়ে অনুপ্রাণিত করতে হবে।
n লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
