মহান একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে লাশের মিছিল পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায়। এর পূর্বে ঐ একই এলাকায় এরকমই অগ্নিকাণ্ডে লাশের মিছিল দেখা গিয়েছিল। পুরান ঢাকায় এরকম হাজার হাজার বাড়ি আছে যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে বসবাস নিষিদ্ধ করা দরকার। হয়ত করেছেও কিন্তু যে-মানুষগুলো সেখানে বসবাস করছে তারা কোথায় যাবে, তাদের নিরাপদ পুনর্বাসন নিয়ে ভাবা হয়েছে কিনা জানি না। জীবনের ভয় সবারই আছে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমার অন্তত আছে; আমি যদি জানি- এই ঘরে থাকলে আমার মৃত্যু ঝুঁকি ৯০ ভাগ, তাই আমি ভাই থাকমু না। কিন্তু থাকব কখন? যখন, আমার আর কোনো আবাস থাকবে না ঐ একখান আবাস ব্যতীত।
পুরান ঢাকার এসকল ঘটনা অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলাফল। পুরান ঢাকা এমনিতেই ঘিঞ্জি এলাকা। যেখানে এমন কিছু বাড়ি আছে যেগুলোর বয়স শত বছর পেরিয়েছে। কিন্তু মানুষগুলো এখনো বসবাস করে যাচ্ছে। এর পেছনের কারণ আছে। খুব ঘিঞ্জি, জ্যাম, দুর্গন্ধের এলাকা হলেও এই এলাকা যাদুর এলাকা। এই এলাকার একটা আলাদা ঐতিহ্য আছে, ইতিহাস আছে যা হাজার বছরের। এখান থেকে এই এলাকার লোকজন বের হতে চায় না, পারে না, পারবেও না। এই কারণে তারা এই সকল বাড়ি না ভেঙে বরং এগুলোকেই সংস্কার করে কোনোরকম থাকার একটা পরিবেশ তৈরি করছে যা তাদের আখেরে বেশি ক্ষতি করছে বলে আমার ছোট জ্ঞান অন্তত তাই বলে। ধরেন একটা জায়গার মাটির কোনো ধারণ ক্ষমতা নাই, আশপাশে অনেক বাড়ি, মাটির নিচের কোনো ভিত নাই কিন্তু তারা দু’তলা থেকে পাঁচ তলা বানিয়ে ফেলছে হরহামেশাই। এসবের জন্য অনুমতির প্রয়োজন হয় নাকি হয় না। নাকি টাকা থাকলেই সব হয়। কিন্তু সেগুলো একরুমেরও হয়ে থাকে এমন বাড়ি অনেক আছে পুরান ঢাকায়। আর জবি শিক্ষার্থীরা হলের অভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসবে বসবাস করে চলেছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি নিজেও প্রায় ৮ বছর এরকম বাড়িতে থেকেছি। রাতে ঘুমিয়েছি। শুয়ে শুয়ে ভাবতাম হয়ত কাল সকালে আর ক্লাস করতে পারব না। ভূমিকম্প হলে তো কথাই নাই। অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, দেশের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী যাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই কিন্তু এরাই নাকি হবে দেশের আগামী দিনের ভবিষ্যত্। এদের নিয়ে জাতির কোনো ভাবনা নাই। মরলেই কি আর বাঁচলেই কি?
আর বিদ্যুত্-এর লাইন, গ্যাসের পাইপ কোনটা কোন দিক দিয়ে গিয়েছে কোন বাড়ির জন্য কোনটা তার হদিস পাওয়া সত্যি খুব মগজের কাজ। তার উপর হাজারো অবৈধ দোকান, কেমিক্যাল, লোহা-লক্কড় আরো কত কি?
মানছি পুরান ঢাকা বাংলার,বাঙালির ঐতিহ্য যা নষ্ট করতে অনেকেই চান না। সবার ভেতরে একধরনের ডায়াস্পোরা কাজ করে। কিন্তু একটি প্রাণ সবার আগে! সচেতনতা সবার দরকার! একটি ঘটনা ঘটলে হইচই, তোলপাড়, লেখালেখি, তদন্ত কমিটি গঠন কত কি? কিন্তু পরক্ষণেই এটা ভুলে যাই। এর পেছনের কারণ খুঁজে তা নির্মূলের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেই না আমরা।
উন্নয়নের ভাষায় কেবল দুর্যোগে রেস্পন্স করি আমরা প্রতিরোধে কাজ করি না।
সময় এসেছে এবার প্রতিরোধে কাজ করুন। টেকসই উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে ঢাকাকে তা নতুন বা পুরান যাই হোক না কেন নতুন করে সাজান, অপরিকল্পিত নগরায়ন বন্ধ করুন। আর যে পরিকল্পনাগুলো হচ্ছে তা কতটুকু টেকসই আর বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করুন। আপনার ইঞ্জিনিয়ার, ফায়ার সার্ভিস আরবান ডেভেলপমেন্ট সব ডিপার্টমেন্টকে বলুন টাকা নিয়ে ফাইল সাইন বন্ধ করতে। আর কোনো বিভীষিকার রাত চাই না আমরা। প্লিজ বন্ধ করুন এসব।
n লেখক:শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
