একজন আলোর ফেরিওয়ালার বিদায়

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৯, ২১:৫০

নিজের টাকায় বই কিনে নিতেন। আর সেই বই ঝোলা ভর্তি করে বেরিয়ে পড়তেন বিলি করার জন্য।  মাইলের পর মাইল পথ হেঁটে একেক দিন একেক গ্রামে গিয়ে দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে দেন সেই বই। আবার যখন বইটি পড়া শেষ হয়ে যায়, ঠিক তখনই হাজির হয়ে কড়া নেড়ে দেন। ফেরত্ নিতেন পড়া হয়ে যাওয়া বইটি তার সঙ্গে আরেকটি বই দিতেন পড়ার জন্য। এভাবে বই ফেরি করেন বলে ছোটরা বলেন ‘বইওয়ালা দাদুভাই’ আর বড়রা বলতেন ‘বইয়ের দুলাভাই’ বলে। অনেকে আবার-সহজ সরল মনের মানুষ বলেও ডাকেন। বইওয়ালা দাদুভাই বা বইয়ের দুলাভাই সহজ-সরল মানুষটির নাম হলো পলান সরকার।

আমার খুব ইচ্ছে ছিল, এই বইয়ের ফেরিওয়ালার সঙ্গে দেখা করতে। একদিন ওনার বাড়ির উদ্দেশে বেরও হলাম। বাঘার বাউসা গ্রামে পৌঁছে পলান সরকার স্যারের বাড়িটা কোনদিকে জানতে চাইলে সাবিয়া নামের এক শিক্ষিকা বললেন, ‘দুলাভাইয়ের বাড়ি যাবে? আস তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।’

আমি যে একটু বিব্রতবোধ করেছি সেটা মনে হয় তিনি বুঝলেন। তাই তিনি হেসে বললেন, আসলে তোমার পলান সরকার স্যারই আমাদের সবার বইয়ের দুলাভাই। ওনাকে আমরা বইয়ের দুলাভাই বলেই ডাকি আর উনিও খুব খুশি হন। পলান সরকার স্যার যে খুব সহজ-সরল, অতো ঘোর-প্যাঁচের মানুষ না তা তিনি বার বার বললেন। আমি উনাকে বললাম যে, উনার দেওয়া বই পড়েন কি না?

উনি হাসলেন! তারপর বললেন, উনার বই শুধু আমি পড়ি না দুলাভাইয়ের দেওয়া বই আমার স্বামী, ছেলে, মেয়ে সবাই পড়ে। এসব কথা আমি মন্ত্রমুগ্ধভাবে শুনছি আর হাঁটছি। এমন সময় উনি বলে উঠলেন, ওই তো তোমার স্যার বইয়ের দুলাভাই। আমি অবাক হয়ে গেছি! বয়স অনেক! হাঁটতে ঠিকমত পারেন না। কথা বলার সময় ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে অথচ এখনও মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বই দিচ্ছেন। আমি স্যারকে প্রণাম করে একটা ভ্যানে চড়ে তার বাড়ি পৌঁছলাম। স্যারের বৌমা তখন রান্না করছিলেন। আমাকে দেখে একটু বিব্রত বোধ করলেন। আমি যে স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি তা বললাম। তারা অতিথির মতো আপ্যায়ন করতে লাগলেন। স্যার প্রায় কথা বলতে পারেন না। স্যারের ভাই বললেন, ও ছোট থেকেই প্রচুর পরিশ্রম করত। আমরা বাইরে যেতে বাধা দিলেও তবুও জোর করে যায়। স্যারের গড়া পাঠাগারটায় গেলাম। তারপর স্যারের সঙ্গে নাস্তা করে বিদায় নিলাম। কি এক সহজ-সরল মানুষ দেখলাম নিজ চক্ষে।

নাটোরের আমগাছে ঢাকা বাগাতিপাড়া গ্রামে এই বই ফেরিওয়ালা সহজ-সরল মানুষটির জন্ম হয় ১৯২১ সালে। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে তার বাবার মৃত্যু হয়। ৪র্থ শ্রেণি পড়ার পর অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর নানা পলান সরকার ও তাঁর মাকে তাঁর নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন রাজশাহীর বাউসা গ্রামে। প্রাতিষ্ঠানিক  শিক্ষা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত গড়ালেও তার মধ্যে বই পড়ার জেদ থেকেই যায়। তাই তিনি বই পড়া চালিয়ে যান উদ্যাম গতিতে। নিজে যেমনি পড়তেন ঠিক তেমনি অন্যরাও যেন পড়ে তার জন্য তিনি স্কুলে যারা ভালো করতেন তাদের বই উপহার দিতেন। ১৯৯২ সালে তার ডায়াবেটিকস ধরা পড়ে। ডাক্তার তাকে প্রচুর হাঁটতে বললেন। তিনি হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুললেন। তখনই তার মাথায় আসল হাঁটার মাঝে বই বিতরণের অভিনব চিন্তাটা। এভাবেই বই পড়ার ভিত গড়ে উঠল। নিজের টাকায় বই কিনে বাড়ি বাড়ি  গিয়ে বই বিতরণ শুরু করে দিলেন।

এই সহজ-সরল মানুষটির সহজ-সরল কাজেই একদিন যে অভিনব স্বীকৃতি পাবে তার প্রমাণ ২০১১ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক লাভ। অবাক করার বিষয় এখানেই শেষ নয়। সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার দৈনিকগুলো ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ পলান সরকারের নামে একটি  প্রতিবেদন প্রকাশিত করে। তাকে নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন নির্মাণ করে নাটক ‘অবদান’।

 বিনামূল্যে বই বিতরণ করা এই সাদামনের মানুষটি গত ১লা মার্চ আমাদের ছেড়ে চলে যান। তিনি চলে গেলেও তার গড়া ‘পলান সরকার পাঠাগার’ আর  তার বিতরণ করা জ্ঞানের আলো জ্বলবে আজীবন। 

n লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়