নিষিদ্ধ কারখানায় নামি কোম্পানির নকল ওষুধ

আপডেট : ১৩ জুন ২০১৫, ০০:০১

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর বিভিন্ন সময় নিম্নমানের ওষুধ তৈরিসহ নানা অভিযোগে বেশ কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে সেই সব নিষিদ্ধ কারখানায় গোপনে নামিদামি কোম্পানির ওষুধ তৈরি করে বাজারে ছাড়ছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। এসব ওষুধ বিক্রিও হচ্ছে দেদারছে। তবে ক্রেতাদের আসল-নকল চেনায় কোন উপায় না থাকায় প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন তারা। এই সিন্ডিকেটে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের অসাধু কর্মকর্তাদেরও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

 
জানা গেছে, দীর্ঘদিন এসব নকল ওষুধ খাওয়ার পরেও রোগীরা সুস্থ হচ্ছে না। পরে এসব রোগী চিকিত্সকদের কাছে গেলে চিকিত্সকরাও অবাক হয়ে যান। কেননা এমনটা হওয়ার কথা নয়। পরে এসব রোগীদের একই ওষুধ দেশের বাইরে থেকে কিনে খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিত্সকরা। পরে দেখা গেছে সেই ওষুধ খেয়ে তারা সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
 
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশে ২৭৭টি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের মধ্যে ২০৯টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালু রয়েছে। লাইসেন্স বাতিল করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ২৬টি প্রতিষ্ঠান, ২টি প্রতিষ্ঠানের উত্পাদন ও বাজারজাত স্থগিত করা হয়েছে এবং ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে।
 
বন্ধ করে দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- এডকো ফার্মাসিউটিক্যাল এন্ড কেমিক্যাল, অগ্রণী ফার্মাসিউটিক্যালস, এলবার্ট ডেবিড (বিডি), এলিয়েন্স কেমিক্যাল, আলফা ফার্মাসিউটিক্যালস, বাংলাদেশ ইমমিউনিটি কো., সিটি কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল, কুমিল্লা ল্যাবরেটরিজ, ক্রিসেন্ট ফার্মাসিউটিক্যাল, ইস্টার্ন ড্রাগ কো, ইস্টার্ন ফার্মাসিউটিক্যালস, জনসেবা ফার্মাসিউটিক্যালস, মান্নাকো ল্যাবরেটরিজ, ফার্মাকো ইন্টারন্যাশনাল, রিলায়েন্স ল্যাবরেটরিজ, রোচ বাংলাদেশ, ইউনাইটেড ল্যাবরেটরিজ, উইনবার্গ ফার্মাসিউটিক্যালস, ওয়েলকাম কেমিক্যাল, ব্লুবেল ল্যাবরেটরিজ, ড. জলিল ফার্মা, এফ.আর.সি ল্যাবরেটরিজ, নাফকো ফার্মা ও জামান ফার্মাসিউটিক্যালস।
 
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করে তাদের মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতে গিয়ে আদেশ স্থগিত করে ফের ওষুধ তৈরি করছে। এই ১১টি প্রতিষ্ঠান হলো- ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস, ওয়েসিস ল্যাবরেটরিজ, রাসা ফার্মাসিউটিক্যালস, প্যারাডাইজ কেমিক্যাল, শামছুল আলামিন ফার্মাসিউটিক্যালস, ট্রপিক্যাল ফার্মাসিউটিক্যালস, স্পার্ক ফার্মাসিউটিক্যালস, ক্রিস্টাল ফার্মাসিউটিক্যালস, বিকল্প ফার্মাসিউটিক্যালস, ডলফিন ফার্মাসিউটিক্যালস এবং এ্যাবলেশন ফার্মাসিউটিক্যালস।
 
অভিযোগ রয়েছে, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের এক শ্রেণির ‘ড্রাগ সুপার’ নিজের চাকরির পাশাপাশি নিম্নমানের ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে চাকরি করে তিনগুণ বেতন নিচ্ছেন। জানা গেছে, একটি থানায় ওষুধ বিক্রির বৈধ লাইসেন্স রয়েছে প্রায় ২ হাজারটি। তবে অবৈধ লাইসেন্স রয়েছে বৈধ লাইসেন্সের পাঁচগুণ। অবৈধ ওষুধ বিক্রেতাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেন কর্মকর্তারা। প্রতিজনের কাছ থেকে ১০/২০ হাজার টাকা করে নেয়া হয়। প্রতি থানা থেকেই মাসে প্রায় কোটি টাকা আয় করেন ওই অসাধু কর্মকর্তারা।
 
এ প্রসঙ্গে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ওষুধের গুণগত মান যাচাই বাছাই করা যাদের দায়িত্ব তাদের মধ্যে অনেকেই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। এ অবস্থার মধ্যেও ওষুধের গুণগত মান রক্ষায় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে যারা নিয়ম ভঙ্গ করে ওষুধ তৈরি করছে তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
 

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে সংসদের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্তক্রমে বাংলাদেশে ওষুধ উত্পাদনকারী ৭৩টি কোম্পানি পরিদর্শন করে সেগুলোর সক্ষমতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়।  এই পরিদর্শক দলের প্রধান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক আ ব ম ফারুক। পরিদর্শক দল ৬২টি প্রতিষ্ঠানকে পেনিসিলিন, সেফালোস্পোরিন, অন্যান্য এন্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ছাড়া অন্যান্য ওষুধ উত্পাদনের অনুমতি দেয়। পরিদর্শন শেষে তারা একটি প্রতিবেদনও জমা দেয়। পরে সেই প্রতিবেদনে উল্লেখিত পরামর্শ অনুযায়ী অধিদফতর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।