যমুনা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল শনিবার বগুড়ায় বাঁধ ভেঙে সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার প্রায় ২৫টি গ্রাম যমুনার পানিতে প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী ৩৫ হাজার মানুষ। সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলায় বাঁধের ২০ ফুট এলাকা যমুনায় বিলীন হয়েছে। তিস্তার পানি বৃদ্ধিতে নীলফামারীতে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। গাইবান্ধায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে শুরু হয়েছে ভাঙন। এসব এলাকার মানুষেরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি মাঠ, রাস্তা-ঘাট ও বাড়িঘর। অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :
সিরাজগঞ্জ: সদর উপজেলার বালিঘুগরী গ্রামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিত্যক্ত বাঁধের অন্তত ২০ ফুট এলাকা যমুনা নদীতে বিলীন হয়েছে। তবে আরো একটি বাঁধ থাকায় বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি না ঢুকলেও পরিত্যক্ত বাঁধের ভেতরে পানি প্রবেশ করেছে। গতকাল দুপুরে হঠাত্ করে বাঁধ ধসের কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। একই সাথে জেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। গত কয়েকদিনে জেলার ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ চার শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
এদিকে যমুনার পূর্বপার চৌহালী উপজেলার বোয়ালকান্দি থেকে পাথরাইল পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যমুনার ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনে চৌবাড়িয়া পূর্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বীরবাসুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আড়কাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরজাজুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রেহাইকাউলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চৌহালী মহিলা মাদ্রাসার পরিত্যক্ত ভবন ইতোমধ্যেই যমুনায় বিলীন হয়েছে।
গত কয়েকদিনে জেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চৌবাড়িয়া পূর্বপাড়া, চরছলিমাবাদ, হাটাইল দক্ষিণপাড়া ও চরবিনানুই, খাষকাউলিয়া ইউনিয়নের চোদ্দরশি ও উত্তর খাষকাউলিয়া, খাষপুখুরিয়া ইউনিয়নের মিটুয়ানী ও শাকপাল, ওমরপুর ইউনিয়নের পাথরাইল ও শৈলজানা এবং ঘোরজান ইউনিয়নের চরজাজুরিয়া এলাকার ৪ শতাধিক ঘরবাড়ি, বিভিন্ন কাঁচাপাকা স্থাপনাসহ কয়েক শ’ একর আবাদি জমি যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে।
বগুড়া অফিস: নির্মাণাধীন রিংবাঁধ ভেঙে যমুনা নদীর স্রোতের পানিতে প্লাবিত হয়েছে জেলার সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার প্রায় ২৫টি গ্রাম। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। শত শত হেক্টর জমির আঊশ ও পাট ক্ষেত ডুবে গেছে। শুক্রবার বিকালে বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার পর প্রবল স্রোত ও বৈরী দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে গতকাল পর্যন্ত তা মেরামত কাজ শুরু করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে গোদাখালী ছাড়াও ঘুঘুমারি-চন্দবাইশা এলাকায় নির্মাণাধীন বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বর্তমানে সেই পয়েন্টগুলোতে জরুরিভিত্তিতে কাজ করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।
গতকাল সরেজমিনে ভাঙন কবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই কেউ টিনের চালা খুলে নিয়ে যাচ্ছেন অন্যত্র। আবার অনেকেই বাঁধের পাশে থাকা পুরনো বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে। সকলের চোখে-মুখেই উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা ।
জানা যায়, চলতি বছরের মে মাসে সারিয়াকান্দির বড়ইকান্দি থেকে শুরু করে কামালপুরের দাঁড়িপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ (রিংবাঁধ) নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত বাঁধটির ৭০ ভাগ নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। হঠাত্ করে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করায় আগাম বন্যার আশঙ্কা দেখা দেয়। ফলে গত কয়েকদিন যাবত্ বাঁধের বাকি ৩০ ভাগ কাজ করা নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা শঙ্কিত ছিলেন। এরই মাঝে শুক্রবার বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে হঠাত্ করেই যমুনার প্রবল গতি ধসে ফেলে নির্মাণাধীন বাঁধের গোদাখালী পয়েন্টের প্রায় ৬০ মিটার জায়গা। মুহূর্তেই হু হু করে পানি প্রবেশ করতে থাকে আশপাশের জনপদে। শনিবার সকালের মধ্যেই সারিয়াকান্দি ও ধুনটের অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে চরম দুর্বিপাকে পড়েন স্থানীয় মানুষ। ফলে এই পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বয়ে যাবার কারণে যতই সময় যাচ্ছে, ততই বাড়ছে দুর্ভোগে পড়া মানুষের সংখ্যা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমীন জানান, নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে গোদাখালী ছাড়াও ঘুঘুমারি-চন্দবাইশা এলাকায় নির্মাণাধীন বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বর্তমানে সেই পয়েন্টগুলোতে জরুরিভিত্তিতে জিওট্যাক্স ও বালির বস্তা ফেলে ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। কারণ এই পয়েন্টে ভাঙ্গন রোধ করা না গেলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিবে। পাউবো’র বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, স্থানীয় অনেকেই না বুঝে অভিযোগ করেন। কিছু কাজ হয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে। এগুলো অনুমোদন হয়ে আসতে সময় লাগে। আর কিছু কাজ হয় জরুরি ভিত্তিতে। গত বছর রহদহ বাঁধ ভেঙ্গে যাবার পর নতুন এই রিংবাঁধটির জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়। ধারণা করা হয়েছিল বর্ষার আগেই পুরো বাঁধটির নির্মাণ শেষ হবে। কিন্তু উজান থেকে আসা পানির স্রোতের কারণে এবছর আগাম বন্যা দেখা দিয়েছে। ফলে বাঁধটির ৭০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হলেও বাকি ৩০ ভাগ কাজ শেষ করা যায়নি।
নীলফামারী: ভারী বর্ষণের সাথে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তা নদী রাক্ষুসী রূপ ধারণ করেছে। তিস্তা পয়েন্টে পানি বিপদসীমার প্রায় ৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভাটি অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তার বাঁধের সবক’টি গেট খুলে দেয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, গত তিন দিন থেকেই তিস্তায় পানি বেড়ে বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছিল। তিস্তা জিরো পয়েন্টের একাধিক সূত্র জানায়, প্রচণ্ড শব্দে কাদা পানি আছড়ে পড়ছে তিস্তায়। উজানে ভারী বর্ষণের ফলে গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দিয়েছে পরশী দেশ ভারত। পাউবোর সূত্রগুলো জানায়, শনিবার রাতে পানি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। এদিকে তিস্তায় পানি বৃদ্ধির ফলে ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলার, গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে হাঁটু থেকে কোমড় পানিতে ডুবে গেছে ছোটখাতা, পশ্চিম বাইশপুকুর, পূর্ব বাইশপুকুর, কিসামত ছাতনাই, পূর্বছাতনাই ঝাড়শিঙ্গেরশ্বর, বাঘেরচর, টাবুর চর, ভেন্ডাবাড়ী, ছাতুনামা, হলদিবাড়ী, একতারচর, ভাষানীর চর, কিসামতের চর, ছাতুনামাসহ এর আশপাশের চরে অবস্থিত গ্রামগুলো। ফলে পানিতে আটকা পড়েছে এসমস্ত গ্রামের ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ। অপরদিকে অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা ছোটখাতার সুপরিটারী গ্রামের বালুরবাঁধ তিস্তা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে গত শুক্রবার রাতে।
গাইবান্ধা : গত কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গাইবান্ধার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি শনিবার বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর, হরিপুর, গাইবান্ধা সদর উপজেলার মোল্লারচর, ফুলছড়ি উপজেলার ফুলছড়ি, ফজলুপুর, গজারিয়া, এরেন্ডাবাড়ি, উদাখালি, উড়িয়া ও সাঘাটা উপজেলার হলদিয়ার ইউনিয়নের তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ চর এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। অনেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সরকারি জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন।
অপরদিকে পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে নদী ভাঙ্গন। হুমকির মুখে পড়েছে ফুলছড়ি উপজেলার সিংড়িয়া, গাইবান্ধা সদর উপজেলার মিয়াপাড়া ও কুটিপাড়া এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। এছাড়া গত দুই দিনের নদী ভাঙ্গনে ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ৪শ’ পরিবার গৃহহীন হয়েছে।
এদিকে তিস্তা নদীর পানির স্রোতে শুক্রবার সুন্দরগঞ্জ পৌর এলাকায় নির্মিত রামডাকুয়া সেতুটি ভেসে গেছে। ফলে উপজেলা সদরের সাথে ২০ গ্রামের মানুষের সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ওইসব গ্রামের মানুষ কলার ভেলা ও নৌকায় পারাপার হচ্ছেন।
ভাঙন কবলিত এলাকার স্থানীয়দের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানরা জানান, সাঘাটা উপজেলার গোবিন্দি, বাঁশহাটা, মুন্সিরহাট, সাথালিয়া, উত্তর সাথালিয়া, ফুলছড়ি উপজেলার সিংড়িয়া, রতনপুর, গণকবর, কালাসোনা, কামারপাড়া, জিয়াডাঙ্গা, রসুলপুর, পূর্ব কঞ্চিপাড়া, জোড়াবাড়ি, সাতারকান্দি, নিশ্চিন্তপুর ও খাটিয়ামারী এলাকায় ব্যাপক নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। গত দুই দিনে এসব এলাকার ৪শ পরিবার গৃহহীন হয়ে বাঁধ ও অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। শত শত বিঘা আবাদি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে ওই সব গ্রামের নদী তীরবর্তী এলাকার কমপক্ষে আরো এক হাজার পরিবার। তারা আতঙ্কে পরিবার-পরিজন, গরু, ছাগল ও ঘর-বাড়ি সরিয়ে নিয়ে উঁচু জায়গা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল আউয়াল মিয়া জানান, গাইবান্ধার সব নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও ব্রহ্মপুত্র ছাড়া তিস্তা, করতোয়া ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি আরো জানান, ফুলছড়ি উপজেলার সিংড়িয়া-রতনপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের এক কিলোমিটার এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাঁধটি ভেঙে গেলে কমপক্ষে ৪টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের বাড়িঘর ও হাজার হাজার একর ফসলি জমিসহ রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যাবে। তবে ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে বালুর বস্তা ও জিও ব্যাগ ফেলছে। এছাড়া অবিরাম ভারী বর্ষণে গাইবান্ধা সদর উপজেলার মিয়াপাড়া ও কুটিপাড়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে যাওয়া অংশের মেরামতের কাজ করে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সিংড়িয়া-রতনপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে জিওব্যাগ ডাম্পিং কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী অরুন কুমার সেন জানান, সিংড়িয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে প্রাপ্ত বরাদ্দকৃত ৫ কোটি টাকা দিয়ে ৬৪ হাজার বালিভর্তি জিওব্যাগ ড্যাম্পিং করা হবে। ইতোমধ্যে ভাঙন প্রতিরোধে ১৪ হাজার জিওব্যাগ ফেলানো হয়েছে। জিওব্যাগ ড্যাম্পিংয়ের ফলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙন অনেকটাই কমে এসেছে।
সাঘাটা (গাইবান্ধা): গত শুক্রবার সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে সাঘাটা পয়েন্টে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি নদী ভাঙনে ইতিমধ্যেই গোবিন্দপুর, বেড়া, হলদিয়া, চিনিরপটল, গোবিন্দি, বাঁশহাটা, কামারপাড়া, মুন্সিরহাট, পাখিমারা ও পাতিলবাড়ি গ্রামের প্রায় ৩শ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শেষ সম্বল হারানো পরিবারগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, স্কুল ও মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে। ভাঙন হুমকিতে রয়েছে গোবিন্দপুর কমিউনিটি ক্লিনিক, গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়, বেড়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, হলদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কানাইপাড়া দাখিল মাদ্রাসা, গোবিন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভরতখালী ঐতিহ্যবাহী কালিমন্দির, এসকেএস ফাউন্ডেশন ও ভরতখালী গো-হাট। এদিকে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার বুগারপটল, গোবিন্দি, কামারপাড়া, নামাপাড়া, কোয়ালিকান্দি, ভগিরছা, বাঁশহাটা, মুন্সিরহাট, পান্সিপাড়া, হলদিয়া ইউনিয়নের দিগলকান্দি, পাতিবাড়ি, গাড়ামাড়া, গোবিন্দপুর, নলছিয়া, থৈকরেরপাড়া, পাখিমারা, কানইপাড়া, শেনগুয়া ও ঘুড়িদহ ইউনিয়নের চিনিরপোটল মৌজা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপন স্থবির হয়ে পড়েছে। এছাড়া পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে পাট, তিল, পটল, করলা, মরিচ ও ঢেঁড়সসহ বিভিন্ন বর্ষাকালিন ফসল।
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ): উপজেলার তারাবো পৌরসভা ও গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ জলজটের শিকার হয়েছেন। তিন দিনের টানা বর্ষণে কোমরপানিতে তলিয়ে গেছে উপজেলার তারাবো পৌরসভার আড়িয়াবো, তেতলাবো, কান্দাপাড়া, মৈকুলী, দীঘিবরাব, বরাব, কামালনগর, গোলাকান্দাইলের বিজয়নগর, নাগেরবাগ, বোচারবাগ, গোলাকান্দাইল দক্ষিণপাড়া এলাকা। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র জলজট। গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা বর্ষণে চারদিকে জলমগ্নে পরিণত হয়। রাস্তার পানি উপচে পড়ছে বাসাবাড়িতে। প্রায় লক্ষাধিক মানুষ হয়ে পড়েছেন পানিবন্দী। এ অবস্থা উত্তরণে তারাবো পৌর কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ করেছেন।
তারাবো পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম চৌধুরী জলাবদ্ধতা এলাকা পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের জানান, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা দিয়ে যে পানি নিষ্কাশন হয় তার চেয়ে বেশি পরিমাণ পানি এসে জমে যায়। ফলে জলজটের কারণে উপজেলার তারাবো পৌর এলাকার নিম্নাঞ্চলের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। তিনি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জলজট নিরসনের ঘোষণা দিয়েছেন।
ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহ খামার বাড়ি কর্তৃপক্ষ জানায়, ময়মনসিংহ সদরে দুই ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এসময় শহরের প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। প্রবল বর্ষণে শহরের ড্রেন উপচে ময়লাযুক্ত নোংরা পানি আবাসিক বাসা বাড়িসহ বিভিন্ন দোকানপাট ও ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ে। হঠাত্ এ বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ কর্মজীবী মানুষ। বৃষ্টির কারণে শহরের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শনিবারের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীরা জানান, বৃষ্টিতে শহরের ব্রাহ্মপল্লী ও নতুন বাজার সড়কে কোমর পানি এবং শহরের বাণিজ্যিক এলাকা রাম বাবু রোড, গাঙিনাপাড়, কাচিঝুলি ও স্টেশন রোডে হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে যায়। শহরের আউটার স্টেডিয়াম ও চরপাড়া নয়াপাড়া, কাচিঝুলি, কলেজ রোড, হামিদ উদ্দিন রোড, পুরহিত পাড়া, নওমহলসহ অধিকাংশ আবাসিক এলাকার বাসা বাড়িতে ময়লাযুক্ত নোংরা পানি ঢুকে শহরবাসীর দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলে। শহরের প্রধান খাল ও ড্রেন ময়লা জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং শহরের ভাটি এলাকার ড্রেন বেদখল হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই এরকম জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। এদিকে বর্ষণের কারণে শহরের কাচিঝুলি সড়কের ওপর একটি বিশাল গাছ উপরে পড়লে প্রায় ১০ ঘণ্টা ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল ও জামালপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল এবং ১১ হাজার কেভি বৈদ্যুতিক লাইন ছিঁড়ে পড়ে শহরের কাচিঝুলিসহ আশে এলাকায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১১ ঘণ্টা বিদ্যুত্ সংযোগ বন্ধ রয়েছে। শহরের জয়নুল আবেদীন পার্ক এলাকায় শহররক্ষা বাঁধের কিছু অংশ এ ভারী বর্ষণের কারণে ধসে পড়েছে। ময়মনসিংহ পৌরসভার মেয়র ইকরামুল হক টিটু জানান, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হলে শহরে এই জলাবদ্ধতার সমস্যা আর থাকবে না।