প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে ৬টি চ্যালেঞ্জ দেখছে বিশ্ব ব্যাংক। বাস্তব সম্মত নয় এমন রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান উন্নয়ন, অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না রাখায় বাজেট বাস্তবায়নের জন্য চ্যালেঞ্জ মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সেইসাথে সুদের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে অন্যান্য ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হওয়া, ভর্তুকির অর্থ আরো দক্ষ ভাবে ব্যবহার করা এবং সংস্কার কার্যক্রম গতিশীল করাকে এবারের বাজেটের চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব ব্যাংক। অন্যদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাগ্রিক অর্থনীতির ৪টি ঝুঁকির বিষয়ে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এগুলো হলো- রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত ইউরোপের পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সংস্কার না হওয়া, তৈরি পোশাক শিল্পের চলতি সংস্কার ও শ্রমিক অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ফিরে আসার আশঙ্কা।
গতকাল সোমবার বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসে আগামী ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়। বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তব্য দেন ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। এতে সূচনা বক্তব্য দেন বিশ্ব ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর সালমান জায়িদী। জাহিদ হেসেন তার বিশ্লেষণে বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বিগত বছরগুলোর মতো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ফিরে এলে সেটি অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হয়ে পড়বে। বাজেট বিশ্লেষণে তিনি উল্লেখ করেন, এটি বৃহত্তর আকারের গতানুগতিক বাজেট। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বাস্তব সম্মত নয়। আর্থিক খাত সংস্কারে সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্যোগে ঘাটতি রয়েছে। বিগত ১২ বছরের রাজস্ব আদায় চিত্র বিশ্লেষণ করে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট ২৮ শতাংশ বাড়তি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে; কিন্তু বিগত সময়গুলোতে শুধু ২০০৮ সালে ২৬ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এটি হয়েছে তখন কালো টাকা সাদা করার সুযোগ, কর আদায়ে বিশেষ অভিযান, যৌথবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামের বন্দরের রাজস্ব আদায়ে নিবিড় তদারকি এবং বড় করদাতাদের শনাক্ত করার মাধ্যমে; কিন্তু আগামী অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বাড়তি রাজস্ব আদায়ের জন্য যে পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছেন সেটি গতানুগতিক, বড় উদ্যোগ নেই। কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে কয়েকবছর সময় লেগে যাবে। এসব বিবেচনায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বাস্তব সম্মত নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সাথে বৈদেশিক অর্থ ব্যবহারের যে লক্ষ্য নেয়া হয়েছে সেটিও চ্যালেঞ্জিং। কারণ উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুত অর্থের প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন ডলার ব্যবহার করার লক্ষ্য রয়েছে যা মোট পাইপ লাইনে আটকে থাকা অর্থের ২৪ শতাংশ।
জাহিদ হোসেন বলেন, এবার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে যা আগের তুলনায় বাস্তব সম্মত; কিন্তু চ্যালেঞ্জিং। গড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন কম নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে ফাঁদ বলা হয়, তা নেগেটিভ অর্থে না দেখে পজেটিভ অর্থে মূল্যায়ন করা উচিত। এটি ধরে রাখতে হলেও বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে হবে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ পরিস্থিতির যদি উন্নতি করা যায়, অর্থাত্ এখনকার জিডিপির ২৯ শতাংশ বিনিয়োগ যদি আরো ২ থেকে ২.৫ শতাংশ বাড়ানো যায় এবং বর্তমানের স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হবে না।
প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক বিবেচনায় বাজেটের আকার মোটেও বড় নয়। এবারের বাজেটের আকার বেড়েছে অনুন্নয়ন ব্যয়ের কারণে। বাজেটের আকার বড় বিষয় নয়, বজেটের ব্যয়ের দক্ষতাই বড় বিষয়; কিন্তু বাজেটে অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটে ৩৫ হাজার ১শ কোটি টাকা ব্যয় হবে সুদ পরিশোধে যা আমাদের কয়েকটি খাতে মোট বরাদ্দের চেয়ে বেশি। বাজেটে সুদ-আসল বাবদ যা ব্যয় হবে তা আমাদের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় (১২ হাজার ৫শ কোটি), প্রাথমিক শিক্ষা খাতে ব্যয় (১৪ হাজার ৫শ কোটি), বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতের (১৮ হাজার ৫৪০ কোটি) ব্যয়ের চেয়ে বেশি। বাজেটে অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম কম হওয়ায় সরকারের ভর্তুকি কমেছে। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ২ শতাংশ অর্জন সম্ভব হবে। এটি বাস্তবসম্মত। এ বিবেচনায় জুলাই মাসে সংযত মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করেন তিনি।
বাজেট বক্তৃতায় সরকার ব্যাংকগুলোর শাখা প্রসারের লক্ষ্য থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যাংকগুলোর সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জোর দেয়া প্রয়োজন।
বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য জমি স্বল্পতা, বিদ্যুত্ ও গ্যাস সংযোগ জটিলতা তৈরি করে। সরকার ৩০টি ছোট আকারের অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া বিদেশি চারটি অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের উদ্যোগও রয়েছে। তবে এসব অর্থনৈতিক জোন বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত করার ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন কাজে গতি কম।
সূচনা বক্তব্যে সালমান জায়িদী সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের প্রশংসা করেন এবং এমডিজি পরবর্তী কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। এ সময় বাংলাদেশের আগামী বাজেট বাস্তবায়ন সঠিক ভাবে হবে বলেও আশবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।