এই মাত্র ক’দিন আগের বিস্তীর্ণ তিস্তা নদী গত মাত্র দু’দিনে ভয়ালরূপী হয়ে উঠেছে। রাক্ষুসী রূপে দুই পাড়ের গ্রাম, জনপদ একের পর এক গ্রাস করে চলেছে। প্রায় সারা বছর যে জীর্ণ-শীর্ণ মৃতপ্রায় তিস্তা তার অববাহিকা অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, এক কথায় তার অস্তিত্ব বিলীন-প্রায় করে তোলে সেই তিস্তা এখন ভয়াল রূপ ধারণ করে দুই পাড়ের সেই মানুষদেরই ডুবিয়ে মারার জন্য ঔদ্ধত্যভঙ্গি ধারণ করেছে। তিস্তা এখন সীমান্তের ওপারকে বাঁচাতে এপারকে ধ্বংস করতে মারণ-উদ্যত। দরিদ্র কৃষকের আর ক্ষুদ্র কৃষি-উদ্যোক্তার সর্বস্ব ডুবিয়ে, ভেঙ্গে ধ্বংস করবে তিস্তা। উজান থেকে বিপুল জলরাশি প্লাবনের ধারায় বাংলাদেশে প্রবেশ করায় উত্তরাঞ্চলের সব নদ-নদী এখন ভীতিকর, ভয়াল, বিপদসংকুুুল। খবর পাঠিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা।
নীলফামারী প্রতিনিধি: সোমবার ভোর থেকে তিস্তায় পানি বিপদসীমার ১০-১২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও আতঙ্ক কমেনি তিস্তাপাড়ের গ্রামগুলোতে। রাত হলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে তিস্তাপাড়ে। উজানের ঢল কিছুটা কমলেও ফুলে-ফেঁপে থাকা তিস্তা রাক্ষুসী রূপ নেয়ায় চরম আতঙ্ক নিয়ে রাত পার করছেন তিস্তাপাড়ের হাজার হাজার পরিবার। বিশেষ করে নারী-শিশু ও গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তিস্তাপাড়ে বসবাসকারীরা।
গত ক’দিন থেকে রাত হলেই তিস্তায় হু হু করে পানি বেড়ে দুই কূল ছাপিয়ে গ্রামের পর গ্রাম হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার পরিবার ও গবাদিপশু। গত চারদিন ধরে রাত বাড়ার সাথে সাথে তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের সব ক’টি গেট খুলে রাখা হলেও তিস্তাবেষ্টিত ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার ১৫-২০টি গ্রামের পাঁচ সহস্রাধিক পরিবার, হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি। ভোররাত থেকে তিস্তায় পানি কমতে শুরু করছে। বিপদসীমার নিচে নেমে গেলেও হাঁটু থেকে কোমর পানিতে আটকাপড়া মানুষ আর গবাদিপশুর দুরবস্থার শেষ নেই। ঘরের চালে, গাছের ডালে, কলার ভেলা আর মাচায় চাল-চুলা নিয়ে বানভাসীরা ঠাঁই নিলেও গবাদিপশু নিয়ে পড়েছেন বিপাকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, তিস্তার উজানে বর্ষণ কমে যাওয়ায় ঢল কমতে শুরু করলেও ভাটি এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের পশ্চিম বাইশপুকুর, পূর্ব বাইশপুকুর ছোটখাতা গ্রাম হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে আছে। এছাড়া খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের কিসামত ছাতনাই চরের প্রায় চারশত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়। একই অবস্থা পূর্ব ছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ি, খগাখড়িবাড়ী-গয়াবাড়ী, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী ও জলঢাকা উপজেলার ডাউয়াবাড়ি-শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের। ১৫-২০টি গ্রামের ১৫-২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের একজন প্রকৌশলী এ প্রতিনিধিকে জানান, কোনরকম পূর্বাভাস ছাড়াই উজানের দেশ ভারত গজালডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দেয়ায় রাত হলেই তিস্তা রুদ্রমূর্তি ধারণ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের সব গেটে খুলে রাখার পাশাপাশি তিস্তার গতিবিধির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। অপরদিকে পানিবন্দি হাজার হাজার মানুষ চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন। এছাড়া বানের পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে ভাঙ্গন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে তিস্তাপাড়ে। এরইমধ্যে ঝুনাগাছচাপানীসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ভাঙ্গনের খবর পাওয়া গেছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে গতকাল সোমবার ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এছাড়া গতকাল ঘাঘট, করতোয়া নদীর পানি ধীর গতিতে কমছে; কিন্তু তিস্তা নদীর পানি ১১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানিবন্দী মানুষ গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে।
জেলার সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২২৫ হেক্টর জমির আউশ ধান, পাট, আমন বীজতলা ও শাক-সবজি চারদিন ধরে বন্যার পানিতে ডুবে আছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আ.কা.ম. রুহুল আমিন বলেন, বন্যা বেশি দিন স্থায়ী হলে এসব ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হবে। তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় নতুন করে আরো পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ফলে জেলার সাঘাটা, ফুলছড়ি, গাইবান্ধা সদর ও সুন্দরগঞ্জের ২০ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দী। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল মিয়া বলেন, পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে ফুলছড়ি উপজেলার ১০টি পয়েন্টে ভাঙন শুরু হয়েছে। গত চারদিনে এসব গ্রামের চার শতাধিক বাড়িঘর ও অসংখ্য গাছপালা বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কারণে ফুলছড়ি উপজেলার বালাসিঘাটে রেলওয়ে পল্টুন সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ভাঙন কবলিত এলাকায় বালুর বস্তা ফেলে প্রতিরক্ষামূলক কাজ চলছে।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমারসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি সামান্য হ্রাস পেলেও কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। অতিবর্ষণ ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি সোমবার কাউনিয়া পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার বেড়েছে। প্লাবিত হয়ে আছে জেলার ৬টি উপজেলার নদ-নদী তীরবর্তী দেড়শতাধিক চরগ্রাম ও দ্বীপচরগুলো। বন্যাপ্লাবিত এলাকার মানুষের জন্য কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ টন চাউল বরাদ্দ দেয়া হলেও তা এখনো দুর্গতদের মাঝে বিতরণ শুরু হয়নি।
নদ-নদীর পানি সামান্য হ্রাস পেলেও দুর্ভোগ বেড়েছে ১০ সহস্রাধিক পরিবারের প্রায় ৫০ হাজার পানিবন্দী মানুষের। চারিদিক পানিতে তলিয়ে থাকায় গৃহপালিত পশু-পাখির খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ কাঁচা রাস্তাগুলো এখনো পানিতে তলিয়ে থাকায় নৌকা বা কলাগাছের ভেলাই লোকালয়ের সাথে যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন বন্যার্তদের। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান জানান, সোমবার দুপুর পর্যন্ত তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার সামান্য নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে ১৪ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতাঃ উত্তরাঞ্চলের সব নদীতে পানি বাড়ছে। উজানের বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের কারণে যমুনাসহ অন্যান্য নদীর পানি বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে চাটমোহরের গুমানী নদীতেও। প্রতিদিন পানি বাড়ছে। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলোতে পানি প্রবেশ করবে। ইতিমধ্যে উপজেলার নিমাইচড়া ও হান্ডিয়াল ইউনিয়নের মাঠগুলোতে বর্ষার পানি প্রবেশ করেছে। কিনু সরকারের জোলার স্লুইসগেট বন্ধ থাকলেও পানি প্রবেশ করছে বিলে। অস্বাভাবিক ভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদী ভরে গেছে। নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে জড়িত রয়েছে এ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য। গুমানী নদীর পানি ভাটির দিকে না গিয়ে ধাবিত হচ্ছে উজানের দিকে। চাটমোহর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিলে পানি পড়লেও এখন পর্যন্ত তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে জমির নাবি আমন ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সোনাতলা (বগুড়া) সংবাদদাতাঃ সোনাতলায় যমুনা নদীতে বন্যায় তিনটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা।
গত কয়েক দিন যাবত্ যমুনা নদীতে বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উপজেলার তেকানী চুকাই নগর, পাকুল্লা ও মধুপুর (আংশিক) ইউনিয়নের ৫১০ হেক্টর জমির পাট ও ১৭৫ হেক্টর জমির আউশ ধানের ক্ষেত বন্যায় আক্রান্ত বা নিমজ্জিত হয়েছে বলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দীন সরদার জানিয়েছেন। এদিকে সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।