যুদ্ধের কিনারা থেকে ফেরা

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৯, ২২:২১

যুদ্ধের কিনারায় চলে গিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার দুই শত্রু দেশ ভারত ও পাকিস্তান। কিন্তু সেই সামরিক উত্তেজনা গত তিন দিনে কমে এসেছে। জন্মের পরই কাশ্মির নিয়ে দ্বন্দ্বে থাকা দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক কখনো গড়ে ওঠেনি। যদিও কিছু আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়েছে বলা যাবে না।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে জঙ্গি হামলায় ৪০ জনের বেশি ভারতীয় সেনা নিহত হয় যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ  মোদীর সরকারকে প্রতিশোধ নেওয়ার চাপে ফেলে দেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণকে শান্ত করতে এবং আগামী নির্বাচনে সুবিধা নিতে বর্তমান সরকারের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক না করার উপায় ছিল না। তবে সেই প্রতিশোধ যেন দুই দেশকে পুরোপুরি যুদ্ধের দিকে না নিয়ে যায় সেই বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হয়েছে। এক্ষেত্রে যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

উত্তেজনায় পানি পাইলটের মুক্তিতে: গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত পাকিস্তানের বালাকোটে যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা চালায়। এতে সাড়ে ৩শ’ জঙ্গি হত্যার দাবি করে ভারত। তবে পাকিস্তান সেই দাবি নাকচ করে দিয়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি বুধবার দুই দেশই একে অপরের সীমানার ভেতরে বিমান হামলা চালায়। ভারত পাকিস্তানের একটি এবং পাকিস্তান ভারতের দুটি বিমান ভূপাতিত করার দাবি করে। বুধবারই ভারতের পাইলট অভিনন্দন বর্তমান পাকিস্তানের হাতে আটক হন। ভারত প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে জানায়, তাদের এক পাইলট নিখোঁজ রয়েছেন। তাকে নিরাপদে কোনো শর্ত ছাড়াই মুক্তির দাবি জানায় নয়াদিল্লি। পাইলটের আটকে যেমন পাকিস্তান চাপে পড়ে তেমনি ভারত সরকারও সাধারণ মানুষের চাপে পড়ে। বৃহস্পতিবারই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাইলটকে মুক্তি দেওয়ার কথা জানান। তিনি শান্তির জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। তবে ভারত জানায়, এতে তাদের কূটনৈতিক জয় হয়েছে। ব্রিটিশ মিডিয়া দ্য গার্ডিয়ান এবং রয়টার্স জানিয়েছে, পাইলটের মুক্তির পরই দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা কমেছে। যদিও শুক্রবার রাত থেকে শনিবারের গোলাগুলিতে দুই দেশের অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন।

দু’দেশের মধ্যে এবারের সংঘাতের বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রকাশিত হলে হয়তো সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে যে একজন পাইলটের জন্য শত শত বা হাজার হাজার মানুষের জীবন বেঁচে গেছে। পাইলট যদি বেঁচে না থাকতেন তাহলে ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিশোধের দাবি থাকতো প্রবল, তখন প্রধানমন্ত্রী মোদীর হাতে অন্য কোনো রাস্তাও হয়তো খোলা থাকতো না। কাশ্মিরের সামপ্রতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা আপাতত স্তিমিত হলেও দু’দেশের রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষ আর গণমাধ্যম এ বিষয়ে উত্তপ্ত আলোচনা যে এখানেই ছেড়ে দেবে না, তা বলাই বাহুল্য। তবে সামনের দিনগুলোতে যদি আর যুদ্ধ না হয় তাহলে সেটি হবে দুই প্রতিবেশি দেশের যুদ্ধের কিনারা থেকে ফিরে আসা।

ভূমিকা নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন: যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র। বর্তমানে চীনকে মোকাবেলায় দেশটি এশিয়ায় ভারতকে সঙ্গে নিয়েই তার অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন চাইলে দুই দেশকে যুদ্ধের কিনারা থেকে সরিয়ে আনতে পারে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র এমন ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের কথাই ধরা যাক। তত্কালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন নিজ উদ্যোগে কূটনীতির মাধ্যমে পাকিস্তানকে সীমান্ত থেকে সেনা সরিয়ে আনতে সফল হয়েছিলেন। দুই দেশের আলোচনার সময় তার নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। আবার ২০০১ সালে ভারতের পার্লামেন্টে হামলা চালায় জঙ্গিরা যার জন্য নয়াদিল্লি ইসলামাবাদকে দায়ী করে। তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল এবং অন্যান্য মার্কিন কূটনীতিক সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন থেকে ভারতকে বিরত রাখতে সক্ষম হন। আর পাকিস্তানকে কাশ্মিরের জঙ্গিদের কাছ থেকে দূরে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ২০০২ সালের মে মাসে আবার ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে জঙ্গি হামলায় ৩১ জন নিহত হলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে নয়াদিল্লি। সীমান্তে সৈন্য পাঠায়। যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়; কিন্তু কলিন পাওয়েলের কূটনীতিতে সেই যাত্রায়ও দক্ষিণ এশিয়া যুদ্ধ থেকে বেঁচে যায়। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই দেশের পরিস্থিতিকে ভয়ানক উল্লেখ করে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

২০০১-০২ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যেমন সম্পর্ক ছিল এখন তেমনটি নেই। ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের সহায়তায় কাটছাঁট করেছেন। অনেক কিছু বন্ধও করে দিয়েছেন। ফলে চীন এক্ষেত্রে ভূমিকা নিতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক সম্পর্ক গভীর। পাকিস্তানও গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। লন্ডনের এসওএস ইউনির্ভার্সিটির চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ তেজাং বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হলে চীনের তেমন কোনো লাভ হবে না। চীন চাইবে না তার ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তান যুদ্ধে হেরে যাক। তাই বেইজিং ভারতের সঙ্গে কোনো যুদ্ধ চায় না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে দুই দেশের উত্তেজনা হ্রাস করতে পারে।