মন্থর অর্থনীতি, বিপুল বেকারত্ব এবং গত বছরে অনুষ্ঠিত পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর বেকায়দায় পড়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। এছাড়া বিরোধীদলগুলো একজোট হয়ে লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। এসবের মধ্যে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের পুলওয়ামায় কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বহরে জঙ্গি হামলায় ৪০ জনের বেশি সিআরপিএফ সদস্য নিহত হয়। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদ এই হামলার দায় স্বীকার করে। এরপরই পাকিস্তানকে কড়া জবাব দেওয়ার দাবি ওঠে ভারতের বিভিন্ন মহল থেকে। যদিও এর জবাব দেওয়ার মাধ্যমে আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার সুযোগ আসে নরেন্দ্র মোদীর কাছে!
গত মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তানের বালাকোটে জইশ-ই-মোহাম্মদের ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায় ভারতের বিমান বাহিনী। ভারতের দাবি, এই হামলায় তিনশোর বেশি জঙ্গি নিহত হয়েছে। এই হামলার পর ভারতের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ-উল্লাস করে ভারতীয় জনগণ তথা বিজেপি’র নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা। বিশ্লেষকরা বলছিলেন, ১৯৭১ সালের পর পাকিস্তানে বিমান হামলা নরেন্দ্র মোদীকে আগামী নির্বাচনে বড় সুবিধা এনে দেবে। সেদিনই কর্নাটকে বিজেপির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিএস ইয়েদুরাপ্পা জানান, বিমান হামলা লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির পালে হাওয়া লাগাবে। শুধু কর্নাটকেই বিজেপি ২২টির বেশি আসন পাবে বলে বিশ্বাস তার। শুধু তিনি নন বিজেপি’র অনেকের দাবি এ রকমই। যদিও প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজে এই হামলার কৃতিত্ব দাবি করেননি। বিমান হামলার বিষয়টি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়।
কিন্তু পাকিস্তান শুরু থেকেই ভারতের বিমান হামলায় হতাহতের দাবি প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। পাকিস্তানের দাবি ভারতের হামলায় কেউ নিহত হয়নি। উন্মুক্ত জায়গায় ভারতের বিমান বাহিনী বোমা বর্ষণ করেছে। বিবিসি, আল-জাজিরা ও রয়টার্সের মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমের খবরেও ভারতের দাবি সন্দেহযুক্ত হয়েছে। ঘটনার দিন থেকেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেন, পাকিস্তান ভারতের হামলার জবাব নিজেদের সময়মতো দেবে।
ভারতের বিমান হামলার একদিন পর বুধবার ভারত শাসিত কাশ্মিরে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। ভারতের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে তারা। একইসঙ্গে ভারতের বিমান বাহিনীর উয়ং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানকে আটক করে পাকিস্তানি সেনারা। এর একদিন পরই ওই পাইলটকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেন ইমরান খান। একই সময়ে নরেন্দ্র মোদীকে আলোচনায় বসতে প্রস্তাব দেন তিনি। ইমরান খানের এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্বের অনেক দেশ। ভারতীয় পাইলট আটক হওয়ার পরই মূলত চরম উত্তেজনা স্তিমিত হতে শুরু করে। শুক্রবার পাইলটকে হস্তান্তর করা হয়েছে। যদিও নিয়ন্ত্রণ রেখায় থেমে থেমে গোলাগুলির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
আপতদৃষ্টে এখন পর্যন্ত অঘোষিত যুদ্ধে ইমরান খান এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করছেন অনেকে। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে বলা হয়েছে, রাজনীতির ছকে নয়, ক্রিকেটীয় স্টাইলে চক্রব্যুহ থেকে বেরোলেন ইমরান খান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানে হামলা চালিয়ে অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন মোদী। কিন্তু বিমান স্ট্রাইকে হতাহতদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর খবর, পাকিস্তানের পাল্টা হামলা, পাইলট আটক এবং ইমরানের শান্তির বার্তায় একটু হলেও ব্যাকফুটে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। যা নির্বাচনে তার জন্য হিতে-বিপরীতই হতে পারে।
