বাবা দিবসে আমরা গিয়েছিলাম আর দশটা বাবার চেয়ে আলাদা একজন বাবার কথা শুনতে। যিনি এক পা এক হাত দিয়ে রিকশা চালিয়ে তার দুই সন্তানকে পড়াশুনা করাচ্ছেন উন্নত জীবনের আশায়। তিনি চান না তার সন্তানেরা তারমতো জীবন পাক। তার স্বপ্ন তারা ভদ্র জীবন যাপন করবে।
আগামীকাল সোমবার বিশ্ব বাবা দিবস। বিশ্বজুড়ে অনন্য এক মহিমায় পালিত হয় বাবার জন্য দিবসটি। গিফট কেনা, নানা অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতায় আমাদের সমাজে আজ অতি জনপ্রিয় এই দিবস। শান্তিবাগ ১৭ নম্বর লেনের ছয়ফিট বাই সাত ফিট ছোট্ট একটি টিনের ঘরে দিবসটি পালনের প্রস্তুতি না থাকলেও বাবার জন্য বিশেষ একটি দিনের অপেক্ষায় প্রতিদিন প্রস্তুতি নিচ্ছে ঝুমা আর তার ভাই মো. মাসুদ। কারণ তাদের বাবা আর দশটা বাবার চেয়ে অনেক আলাদা।
মাসুদ শান্তিবাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র। ঝুমা আক্তার, শান্তিবাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেনীর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী। সে বড় হয়ে শিক্ষকতা করতে চায়। সবাইতো ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। তুমি কেন শিক্ষক হতে চাও ? এমন প্রশ্নে জবাবে সে জানায় কারণ সেসব হতে অনেক খরচ। যা তাদের বাবার পক্ষে ব্যয় করা সম্ভব নয়।
বাবা তারা মিয়ার বাড়ি নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর থানায়। তিনি জানান তার বয়স যখন আনুমানিক ২৮ কি ৩০ বছর তখন স্টোক করে তার শরীরের ডান অংশ সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যায়। মা ভিক্ষে করে সাভার সিআরপিতে চিকিৎসা করাতে নিয়ে আসেন। সেখানে তাকে বেশ কিছু দিন চিকিৎসা করানোর পর থেরাপি দিতে হয়। ক্রমেই তিনি ডান হাত-পা একটু একটু নাড়াতে পারেন। নেত্রকোনায় বাহাতে কাজ করার সুযোগ নাই। তাই তাকে আবার ঢাকায় আসতে হয় কাজের জন্য। অনেকে তাকে ভিক্ষে করার পরামর্শ দিলেও নিজের দৃঢ় মনোবলের জন্যই একদিন তিনি রিকশা চালানোর কাজ পেয়ে যান। বা হাত-বা পা দিয়ে রিকশা চালাতে প্রথমে অনেক কষ্ট হতো তার। আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হতে থাকেন। তখনও তিনি মাঝে মধ্যে সিআরপিতে গিয়ে থেরাপি নিতেন।
তারা মিয়ার সাড়ে তিন হাজার টাকা ঘর ভাড়দেন। মেয়ের স্কুলের বেতন সাড়ে পাঁচশত টাকা আর প্রাইভেট পড়ার জন্য মাসে ১৮ শ টাকা গুণতে হয়। যদিও ছেলের বেতন নাই তবে তারও প্রাইভেটের জন্য ব্যয় হয় আরও ছয়শত টাকা। প্রতিদিন তার আয় চার শ থেকে ছয় শ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই না পেরেই স্ত্রী রোকেয়াকে মানুষের বাড়িতে ছুটা কাজে যেতে হয়। তবে এতে রোকেয়ার কোন দুঃখ নেই। রোকেয়া বলেন, তার স্বামী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হয়েও সন্তানদের ভদ্রমানুষ বাননোর স্বপ্ন দেখছেন এটাই অনেক বড়। আর ঝুমা বলে, আমার চাচারা সবাই সুস্থ্য কিন্তু তাদের ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা না করে মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে। সেখানে আমার বাবা শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও আমাদের ১০ জনের মতো জীবন দিয়েছে। আমার স্কুলের অনেক স্বচ্ছ শিক্ষিত পরিবারের সহপাঠীরা আছে, তারা কেউ জানে আমার বাবা কত কষ্ট করে আমাকে পড়াচ্ছেন। বাবা সুযোগ পেলেই মানুষের কাছে গল্প করেন আমার মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে, আমি যেদিন পড়াশুনা শেষ করে শিক্ষক হতে পারবো সে দিনই সবাইকে বলবো আমার বাবার কষ্টের কথা।
