সংসারে শান্তি অফিসে মর্যাদা

আপডেট : ২২ জুন ২০১৫, ০৩:০৪
কর্মজীবী নারীকে
 
অফিসের পাশাপাশি সংসারও সামলাতে হয়। অফিসের কাজে অনেক সময় দেশের বাইরেও যেতে হয় নারীকে। অফিসের পাশাপাশি পরিবারকেও খুশি রাখতে হয়। সারাদিন অফিস করলেও সন্তানরা কখনোই যেনো মায়ের অভাব অনুভব না করে সেটাও মাথায় রাখতে হবে। জানাচ্ছেন- সামিহা
 
সুলতানা অনন্যা
 
সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই দুই কাপ চা বসিয়ে দেয়। আর বাচ্চাদের জন্য দুই কাপ দুধ। তারপর এক টেবিলে চারজনের চা-দুধের আসরটা দিনের সবচেয়ে আনন্দমুখর অধ্যায়। বলছিল সোমা। 
 
সোমার ব্যাংকার হিসেবেই চাকরি জীবনের শুরু। দেশের অন্যতম পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে তাদের ব্যাংক একটি। সোমা গত পনের বছর ধরে এ ব্যাংকে চাকরি করছে। অফিসের প্রায় সবাই তার কাজে সন্তুষ্ট এবং খুশি। এজন্য চাকরি ক্ষেত্রে খুব দ্রুতই তার উন্নতি হয়েছে। তিনি বর্তমানে ব্যাংকের বেশ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত রয়েছেন। ব্যাংকে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সার্ভিস দেবার ইচ্ছা এবং পাশাপাশি ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টাই তাকে আজ এ অবস্থানে এনেছে। অফিসে কোন কাজই সে কখনো অর্ধেক ফেলে যায় না এবং ছোট থেকে বড় সব ধরনের কাজই সে দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে সম্পন্ন করছে। কখনো কোন কাজ ছোট বলে তাকে ফেলে রাখে না। বর্তমানে তার সারাদিন নানা ধরনের মিটিং এবং বড় বড় কোম্পানির গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করার মধ্যে দিয়েই কাটে। অনেক সময় সেজন্য তাকে দেশের বাইরেও যেতে হয়। অফিসের পাশাপাশি সে তার পরিবারকেও খুশি করতে পেরেছে।
 
পরিবারের কারোরই তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের অভাব অভিযোগ নেই। সারাদিন অফিস করলেও তার সন্তানরা কখনই তার অভাব অনুভব করে না। অফিসের পরে প্রায় সম্পূর্ণ সময়ই সে রেখেছে তার পরিবারের জন্য। তার এক ছেলে এবং এক মেয়ে। তারা দু’জনই অফিসের ডে-কেয়ার সেন্টারে বড় হয়েছে। বড় ছেলের বয়স আট ও ছোট  মেয়ের বয়স দুই। তার ছোট মেয়েটি অফিসের ডে-কেয়ার সেন্টারেই থাকে। এজন্য তার অফিসের কাজে বাড়ির দুঃশ্চিন্তার কারণে কোন ধরনের ব্যাঘাতই ঘটেনি। সব সময়ই মনে হয়েছে তার সন্তান তার কাছেই আছে। সেজন্য তার কাজের কোন ক্ষতিতো হয়নি বরং সোমা তার দায়িত্ব আরও দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে পেরেছে। এক্ষেত্রে সে ব্যাংকের কাছে কৃতজ্ঞ। এই ডে-কেয়ার সেন্টারের সুবিধা তার চাকরিজীবনের পথকে অনেক মসৃণ করে তুলেছে।
 
তার সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি সে পরিবারের অন্য সবার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করেও চলেছে। ছুটির দিনগুলোতে সে হয় তার সন্তানদের খেলার সঙ্গী। কখনো তাদের সাথে বাড়ির পাশের পার্কে গিয়েও তারা খেলেছে। আবার তার পরিবারের প্রতি এই দায়িত্বশীলতা দেখে তার স্বামীও তার উপর খুশি। তার মানসিক শক্তি তাকে পারিবারিক সুখ ও কর্মক্ষেত্রে এই সাফল্য বজায়  রেখে চলতে প্রতি পদে সাহায্য করেছে।
 
এ সম্পর্কে অপর ব্যাংকার পলির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণ ছেলেদের চেয়ে স্বাভাবিক ভাবে মেয়ের প্রতি সমাজের প্রত্যাশা থাকে বেশি। একজন মেয়েকে কর্মক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হয় যে সে পুরুষদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তেমনি চাকরি করায় তার সন্তান ও পরিবারও যে কোন ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে না সে কথাটিও সমাজে ফুটিয়ে তুলতে হয়। কিন্তু আমার কাছে এটিকে এখন আর কোন ধরনের অতিরিক্ত চাপ মনে হয় না। কারণ আমি সব ধরনের পরিস্থিতি সামলে এগোনোর জন্য যে মানসিক শক্তি প্রয়োজন তা পাচ্ছি আমার পরিবার থেকে। আমার পরিবার আমাকে কর্মক্ষেত্রে এগোবার জন্য সেরকম উত্সাহ দিয়ে আসছে। আমার নিজের ছোট পরিমন্ডলে নারীর ক্ষমতায়নের স্বাদ আমি অনুভব করি। এখন আমার আমিকে দিয়ে একটা নিজস্ব পরিচয় সমাজে দাঁড়িয়েছে। পরিবারে আমার কথার গুরুত্ব আছে। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার মূল্য আছে। এসব কথা যখন মনে হয় তখন কাজ করার শক্তি আরও বহু অংশে বেড়ে যায়।
 
কিন্তু নারীদের অতিরিক্ত এই চাপ সহ্য করার জন্য মানসিক শক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন শারীরিক সুস্থতা। কারণ শরীর যদি ভেঙ্গে পড়ে তবে একজন নারীর পক্ষে আর এগোনো সম্ভব হয়ে উঠে না। আর মন ভাল রাখতে নিজের সখগুলোকে ভুলে গেলেও চলবে না। তাই প্রতিদিন নিজের জন্য, নিজের সখগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য কিছু হলেও সময় রাখুন শরীরকে সুস্থ রাখতে, মনকে উত্ফুল্ল রাখতে নিয়মিত হাঁটা সহ নানারকম শারীরিক ব্যায়াম একান্ত জরুরি। দিনে তিনবার দু-চার মিনিট করে ব্রিদিং এক্সরসাইজ করলে সহজেই সব অবসাদ বা টেনশন দূর করা যায়। যে কেউ পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। প্রয়োজনে অফিসে নিজ সিট হতে উঠে কিছুক্ষণ পর পর হাঁটা এবং লিফটের বদলে সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে উঠা নামা করলেও এক ধরনের ব্যায়াম হয়।
 

ছুটির দিনে ঘর হতে বের হয়ে কোথাও পরিবারসহ বেড়াতে যাওয়া, প্রয়োজনে শহরের মধ্যে পার্কেও যাওয়া যেতে পারে। প্রতি মাসে দু’দিন কি একদিন হলেও বাইরে কোথাও খেতে যাওয়া। স্বামী-সন্তান সবাইকে নিয়ে খেয়ে, ঘুরে পারিবারিক জীবনকে উত্ফুল্ল রাখা। পরিবার ও অফিসের মাঝে সংশ্লিষ্টতা রক্ষার মধ্যে দিয়ে, দুটি ভিন্ন সত্তা না করে এক করে ফেলা। যেন পরিবার আপনার মধ্যে দিয়ে অফিসকে উপলব্ধি করতে পারে। তখন আপনার সাফল্য হবে তাদেরও সাফল্য। আবার অফিস সহকর্মীরাও আপনার পারিবারিক জীবনের আনন্দময় পরিবেশ উপলব্ধি করতে পারবেন। এটা অনেকের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পারে।