বোয়ালখালীতে রেলসেতু ভেঙে তেলবাহী ওয়াগন খালে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় পানি থেকে অয়েল বুম দিয়ে ফার্নেস অয়েল অপসারণের কাজ চলছে। অয়েল বুম দিয়ে পানির উপরিভাগে থাকা তেল আটকে রেখে সাথে সাথে তা নৌকায় তোলা হচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে তেল অপসারণ কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক তেল অপসারণের কাজ করছে। আজ মঙ্গলবারের মধ্যে পানি থেকে ভাসমান তেল অপসারণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। পাশাপাশি ভেঙে পড়া রেলসেতুর মেরামত কার্যক্রম চলছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মো. রমজান আলী বলেন, ‘প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কাজ ধীরগতিতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা গেছে। তারপরও আমরা আশাবাদী আজকের মধ্যে রেললাইন ও ভেঙে যাওয়া সেতু সচল করা হবে।’ জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জোয়ারে ভেসে ইতিমধ্যে তেল অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়েছে। শতাধিক শ্রমিক ভাসমান তেল সংগ্রহের কাজে লিপ্ত রয়েছে। তেল সংগ্রহের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ হয়েছে। শ্রমিকরা গাছের গায়ে লেগে থাকা তেলও সংগ্রহ করছে। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মকবুল হোসেন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, জোয়ার-ভাটার কারণে নদীতে তেল অনেক দূর ছড়িয়ে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে তেল সংগ্রহ কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) জাফর আলম বলেন, ‘পানির প্রবাহ বন্ধ করে অয়েল বুম দিয়ে ভাসমান গাছ ও কচুরিপানার সাথে লাগা ফার্নেস অয়েল সংগ্রহ করা হচ্ছে। নদীতে পানির প্রবাহ বেশি সময় বন্ধ রাখা যাবে না। এতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আজকের মধ্যে অয়েল বুম দিয়ে তেল অপসারণের কাজ শেষ করা যাবে।’
গতকাল সোমবার দুর্ঘনাস্থলে সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাপরিচালক মোজাম্মেল হক, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. মেজবাহউদ্দীন, বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার খন্দকার নুরুল হকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পরিদর্শন করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মজুরির আশায় ৮০ জন শ্রমিক ছড়িয়ে পড়া তেল সংগ্রহের কাজ করছেন। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দৈনিক ৩শ টাকার মজুরির বিনিময়ে কাজ করছেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এভাবে তেল সংগ্রহে জনস্বাস্থ্যে ক্ষতিকর বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রো বায়োলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. সীমান্ত ওয়াদ্দাদার বলেন, এ তেলের ক্ষতিকর টক্সিন পরিবেশের পাশাপাশি মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ তেল সংস্পর্শে দীর্ঘক্ষণ থাকলে চর্ম রোগ দেখা দিতে পারে। চামড়ায় লাল ফুসকরিসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ তেল বাষ্পীয় হয়ে নাক দিয়ে মানব শরীরে প্রবেশ করলে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রবিবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফিরোজ সালাউদ্দিন বলেন, রেলসেতু ভেঙে খালে পড়ে যাওয়া ওয়াগনের তেল ভেসে গিয়ে পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে তা পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়। সবাই মিলে কাজ করলে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব। তেলগুলো বিপিসি থেকে বিদ্যুেকন্দ্র কিনেছে। আমরা কেবল বহন করেছি। বহন করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এজন্য আমরা দুঃখিত।
রেল দুর্ঘটনাকে দুর্যোগ আখ্যা দিয়ে সচিব বলেন, দুর্যোগে সেতু ভেঙে রেলের যে ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পরিবেশের। তেলের কারণে মত্স্যকুল ও গাছ পালার ক্ষতি মারাত্মক। ক্ষতিগ্রস্ত চারটি ওয়াগনের মধ্যে একটি থেকে সম্পূর্ণ তেল উদ্ধার করা হয়েছে। আরেকটির অর্ধেক উদ্ধার করা হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া দু’টি ওয়াগন থেকে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। দু’টিতে ৪৮ থেকে ৫০ টন তেল ছিল। ফার্নেস অয়েল অন্যান্য তেলের মতো নয়। এগুলো বাষ্পায়িত হয় না। আলকাতরার মতো লেগে থাকে। খালের পাড়ের গাছপালায় ২০ শতাংশ লেগে আছে। ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ভাসমান। দুর্ঘটনা নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের গঠিত দু’টি তদন্ত কমিটির পাশাপাশি মন্ত্রণালয় থেকে আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত কমিটিগুলোর রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।