সুন্দরবনে ৬ মাসে ৯ জলদস্যু নিহত

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৫, ১২:১৫
চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে সুন্দরবনে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে ৯ জলদস্যু নিহত হয়েছে। এ নিয়ে ২০০৬ সাল থেকে বিগত দশ বছরে সুন্দর বনে মোট ৭৫ জলদস্যু এনকাউন্টারে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটল। 
 
সাম্প্রতিক সময়ে নিহত ৯ জলদস্যুর মধ্যে ৫ জলদস্যুর বাড়ি পাথরঘাটায়। তারা হলেন- জামান বাহিনী প্রধান জামাল, সাদ্দাম, সোহেল, ছগির ও সোহাগ। এদের নিহত হওয়ার ঘটনায় উপকূলীয় জেলেদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে মর্মে জেলেদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। এবছরই প্রথম জেলেরা দস্যু পাস ছাড়াই সাগরে ইলিশ শিকার করছে মর্মে বরগুনা জেলা মৎসজীবী ট্রলার মালিক সমিতি জানিয়েছেন। 
 
প্রতিবছর ইলিশ মওসুমে সুন্দরবন কেন্দ্রিক জলদস্যুদের বিভিন্ন গ্রুপটোকেন (দস্যুপাস) বাণিজ্যের মাধ্যমে জেলেদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে থাকে। জেলেরাও ট্রলার প্রতি লাখ টাকা প্রদান করে ওই পাস সংগ্রহ করে ইলিশ শিকারে সাগরে যেতে বাধ্য হন।
এভাবে ইলিশ মওসুমে সুন্দরবন কেন্দ্রিক জলদস্যুরা নীরবে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে আসছে।  
 
কথিত আছে এ চাঁদার ভাগ নাকি ওপার ওয়ালারাও পেয়ে থাকতেন। চাঁদা দিয়ে পাস সংগ্রহ না করে সাগরে ইলিশ শিকারে যাওয়া জেলেরা অপহরণ, গুম, খুনের শিকার হতেন। অপহৃত জেলেদের সুন্দর বনের গহীনে দস্যুদের আস্তানায় নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হত। নির্যাতিত জেলেদের কান্নার আওয়াজ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বজনদের শুনিয়ে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করত দস্যুরা।
 
এসবের প্রতিকার না পেয়ে অনেক উঠতি বয়সের জেলে ডাকাতের সাথে সখ্য গড়ে এক পর্যায় জলদস্যুতায় জড়িয়ে পড়ে। 
পাথরঘাটার বলেশ্বর নদীর পাড়ের এরকম প্রায় অর্ধশত যুবক এক সময় জলদস্যুতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। গড়ে ওঠে ডাক্তার বাহিনী, সাগর বাহিনী, জিয়া বাহিনী, জিহাদ বাহিনী, জুলফু বাহিনী, সাইজ্যা বাহিনী, দারোগা বাহিনী, জামাল বাহিনী নামীয়ও প্রায় অর্ধশত জলদস্যু গ্রুপ। 
 
এদের চাঁদাবাজি অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্যের অত্যাচারে পাথরঘাটার মৎস্য ব্যবস্যায়ীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কিছু জেলে মুক্তিপণের টাকা দিতে দিতে নিঃস্ব হয়ে মাছ ধরা ট্রলার বিক্রি করে দেন। কতক আবার পেশাই পরিবর্তন করে ফেলেন। 
 
২০০৬ সালে উপকূলের প্রায় ১০ হাজার জেলে জলদস্যু মুক্ত সাগরের দাবিতে কাফনের কাপড় পরে পাথরঘাটা পৌর শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সরকার জেলেদের দাবির মুখে সুন্দরবনের মধ্যে ও আশপাশে কোস্টগার্ডের বেশ কয়েকটি আউটপোস্ট চালু করে। কিন্তু জেলেদের ভাষ্য মতে ফল তথৈবচ। শেষঅবধি র‌্যাব-৮ ও ৬ সন্দুর বনের সাতক্ষীরা ও শরণখোলা রেঞ্জের নলিয়ান ও মেহের আলী নামক জায়গায় ইলিশ মওসুমে দু’টি অস্থায়ী ক্যাম্প চালু করে। পাশাপশি সোর্সের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে অব্যাহত রাখে অভিযান। এতে সুন্দরবন কেন্দ্রিক জলদস্যুদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দুর্বল হয়ে পড়ে দস্যুরা। এভাবে গত ৬ মাসে ৯টি অভিযানে ৯ জলদস্যু গুলি বিনিময়কালে নিহত হয় বলে র‌্যাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
 
এসময় উদ্বার করা হয়েছে জলদস্যুদের ব্যবহৃত ৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৬ দেশীয় অস্ত্র, ৫ শতাধিক তাজা গুলি ও একটি বাঘ ও ৪৩ টি হরিণের চামড়া। গ্রেফতার করা হয়েছে ১২ জন পাচারকারী। 
IMG0
 
এ বিষয় বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে র‌্যাবের অভিযানে জলদস্যুদের নেটওয়ার্ক তছনছ হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ কারণে দস্যুপাস ছাড়াই জেলেরা এ বছর জলদস্যুমুক্ত সাগরে ইলিশ শিকার করছে। 
 
তিনি আরও বলেন, জিডিপিতে ইলিশের অবদান প্রায় এক ভাগ, তাই জাতীয় স্বার্থে জলদস্যুমুক্ত নিরাপদ সাগর গড়াই এখন সময়ের দাবি। 
 
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুম কোম্পানি জানান, জলদস্যু ফেরাউন বেলাল ও জামাল বাহিনী প্রধান জামালসহ পাথরঘাটার ৫ জলদস্যু নিহত হওয়ায় পাথরঘাটার জেলেরা বর্তমানে শঙ্কা মুক্ত ও স্বস্তিতে ইলিশ শিকার করছেন। এজন্য তারা সমিতিতে  মিলাদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন বলে জানিয়েছেন।