অধিকাংশ অভিভাবকই সন্তানকে চোখে চোখে রেখে বড় করে তুলতে চান। সন্তানের যে আলাদা একটা জগত্ আছে সে কথা তারা ভুলেই যান। পরম মমতায় আগলে রাখা সন্তানটি এত চেষ্টার পরেও হয়তো বিপথে চলে যেতে পারে। সঙ্গদোষ, সন্তানকে নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে না দেওয়া কিংবা বাবা-মায়ের অতিরিক্ত বিধিনিষেধ সন্তানের ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে, সন্তান বিপথগামী হতে পারে। লিখেছেন মাহমুদুল আমিন
কোনো বাবা-মাকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে তারা তাদের সন্তানের ভালো চান না। বেশিরভাগ বাবা-মা চান তাদের সন্তানটিকে নিজেদের মতো করে বড় করে তুলতে। কোনো শিশুই জন্ম থেকেই দুর্বিনীত, অবাধ্য, অশিষ্ট কিংবা নেশাসক্ত হয় না। তবুও ছেলেমেয়েরা বিপথে যায়, অশোভন আচরণ করে, কুসঙ্গে পড়ে, মাদকাসক্তির শিকার হয়। কিন্তু কেন এমন হয়? কোনো ছেলেমেয়েই কিন্তু হঠাত্ করেই বিপথগামী হয়ে যায় না। তার পেছনে একটা গল্প থাকে, একটা ইতিহাস থাকে, থাকে নানা কারণ। পারিবারিক, সামাজিক কিংবা বংশগত বিষয়গুলো খুঁটিয়ে অনুসন্ধান করলে একজন ছেলে কিংবা মেয়ের বিপথে যাওয়ার যথাযথ কারণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। মানুষ শূন্য স্লেট নিয়ে জন্মায়। ঠিক যেন একটা ফাঁকা ঝুড়ি। তারপর একে একে বিভিন্ন উপকরণ দ্বারা ঝুড়িটি কানায় কানায় পরিপূর্ণ হওয়ার মতো করেই মানুষের জীবনে চলার পথের নানা অভিজ্ঞতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে সেই শূন্য ঝুড়িটিই হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ। সেই ঝুড়িতে যেমন ভালো ফল থাকতে পারে, ঠিক তেমনি ভালো ফলের মাঝেই পচা ফলেরও অস্তিত্ব থাকা অমূলক কিছু নয়। তবে নিটোল, সুন্দর সব ফল-ফলাদিতে ঝুড়িটি ভরে তোলার মতো সন্তানকে গড়ে তোলার দায়িত্ব অবশ্যই অভিভাবকদের।
জিনগত বা বায়োলজিক্যাল অসুখ নিয়ে যদি কেউ জন্মায় এবং তার যথাযথ চিকিত্সা না হয়, তাহলে অনেক সময় এসব আনট্রিটেড ডেভেলপমেন্টাল ডিফিকাল্টি মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। অ্যাটেনশন ডিফিসিটি হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার নিয়ে যদি কেউ জন্মায় কিংবা লার্নিং ডিসঅ্যাবিলিটি যদি কারও থাকে এবং প্রথম থেকে তা ধরা না পড়ে, তাহলে সমস্যা দেখা দেবে। সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে না পারলে মরিয়া হয়ে নিজের কমফোর্ট জোন খুঁজবে এইসব শিশুরা। ধীরে ধীরে নিজেদের অজান্তেই অপরাধের পথে পা বাড়াবে। সমাজের বাজে চর্চা হলো—খুব সহজেই একজন মানুষের গায়ে তকমা এঁটে দেওয়া—‘অমুক খুব বাজে ছেলে’, ‘তমুক সাংঘাতিক দুষ্টু’, সেই সাথে সাথে মিথ্যেবাদী, অসভ্য, ড্রাগ অ্যাডিক্টেড এইসব বিশেষণ তো আছেই। যেকোনো খারাপ কাজের চর্চা যারা করে তারাও খারাপ—এমনটাই স্বাভাবিক হিসাব সকলের। কিন্তু কেউ একবার তলিয়ে দেখবার প্রয়োজন বোধ করেন না, এর পেছরে মূল কারণটা কী? একটি ষোলো, সতেরো বছরের ছেলে কেন ড্রাগ নিচ্ছে, কেন একজন স্কুলপড়ুয়া ক্লাসের অন্য সকলের সাথে পাল্লা দিয়ে অংক কষতে পারছে না। এসব খতিয়ে না দেখেই তাদেরকে দোষারোপ করা শুরু করে দেন। সে কারণে, ইতিহাস জানা খুবই অত্যাবশ্যকীয়। আর প্রয়োজন হলে শুরুতেই মেন্টাল ইলনেসের আইডেন্টিফিকেশন করা এবং তার চিকিত্সা করা প্রয়োজন।
একজন শিশুর প্রাথমিক অস্তিত্ব তার মায়ের কোলে। এই চেনা কোলেই তার স্বস্তি, নিরাপদ আশ্রয় ও আস্থা। এটাই ন্যাচারিংয়ের মূলমন্ত্র। একজন শিশুর পথ চলাই শুরু হয় তার বাবা-মায়ের হাত ধরে। সে তার জীবনকে চিনতে শুরু করে তার বাবা-মায়ের চোখ দিয়ে, ভালো-মন্দ বুঝতে শেখে বাবা-মায়ের নীতিবোধ দিয়ে। শিশুর এ কোমল ভূমিটি কেমন করে সাজাবেন—তার দায়িত্ব তার বাবা-মায়ের। এ বড় গুরু দায়িত্ব। আর সে দায়িত্ব পালনে অবশ্যই বাবা-মাকে শিশুর বন্ধুর ভূমিকা নিতে হবে। এতে সন্তান যেমন—পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়ার কথা গলা উঁচিয়ে জানাবে, ঠিক তেমনিভাবে ছবি আঁকায় গোল্লা পাওয়ার কথাও সে এড়িয়ে যাবে না। সন্তান চুল নীল করার জন্য আপনার কাছেই বায়না ধরবে, হয়তো রাগারাগিও করবে, আবার আপনি পড়তে বসতে বললে সে তা মেনে নিয়ে সোজা পড়ার ঘরে চলে যাবে। প্রিয় বন্ধুর সাথে ঝগড়া হলে, সন্তানের মনের খবর তার অভিভাবককেই রাখতে হবে। তারা যেন সন্তানের রোল মডেল হয়ে উঠতে পারেন। সন্তানের আহ্লাদ, স্নেহ-শাসনে, সম্মানে তাকে তার যোগ্য জায়গা দিতে হবে। পাাশপাশি, অভিভাবককেও নিজের জায়গা বজায় রাখতে হবে। অভিভাবক বলেই সন্তানের জন্য আপনি যা ভালো শুধু সেটাই ঠিক—এমনটা মনে করা অনুচিত। সন্তানের জন্য নিয়ম থাকবে, আবার তার জন্য ছাড়ও থাকবে। সন্তানকে মানুষ করতে হলে অভিভাবক হিসেবে সর্বপ্রথম আপনাকেই গেমপ্ল্যান করতে হবে। বয়স অনুযায়ী সন্তানের জগেক খুঁজে বের করতে হবে। সাত আর তেরো কিংবা আঠারো বয়সী ছেলে-মেয়ের মননের অনেক পার্থক্য থাকবে। বাচ্চাকে সময় দিতে হবে। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে ডিনার করা, ভালো-মন্দ খাবার বানিয়ে দেওয়া, ছুটির দিন সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া এমন সব ছোটখাটো অভ্যাসেই দারুণ বন্ধন তৈরি হয়, যা সারা জীবনে অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। বাড়ি যেন তার কাছে স্বস্তির জায়গা হয় সেই দায়িত্ব অবশ্যই একজন অভিভাবক হিসেবে আপনারই। সন্তানের নিজস্ব মত, ব্যক্তি সত্তার উপরে আপনার মতামত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আলোচনা করে সমাধানের পথ করুন। সন্তান পড়াশোনা করছে না বলে সারাদিন তার কানের কাছে ‘পড় পড়’ বলে ঘ্যানঘ্যান না করে, সে যখন নিজের উত্সাহে পড়তে বসে, হোক সেটা দশ মিনিটের জন্য, তাকে উত্সাহ দিন, ভালো বলুন। ভুলেও ছেলেমেয়ের গায়ে হাত তুলবেন না। সন্তানের ওপরে বিশ্বাস রাখুন। আপনি এমন কোনো আচরণ করবেন না, যাতে সন্তান বুঝে ফেলে আপনি তাকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। আর ছেলে-মেয়ের আচরণে পজিটিভ বিষয়গুলো ফুটে উঠতে সবার আগে দরকার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালো সম্পর্ক তৈরি করা। প্রত্যেকেরই অধিকার আছে নিজের মতো করে বাঁচার। তবে সেই তালটা ধরিয়ে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব অবিশ্যই অভিভাবককেই নিতে হবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে না পারলেই যে জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে না, এমন সহজ সত্যগুলো মেনে নিয়ে, খোলা জীবনে চলার শিক্ষাই সবার দরকার। শত কষ্ট হলেও নম্রতা, আস্থার আশ্রয়টুকুকে রক্ষা করতে হবে। তাহলেই বিপথগামিতার হাত থেকে রক্ষা পাবে আপনার সন্তান।
