সংকটে গ্রিস

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৫, ০১:২৫

গ্রিস দীর্ঘকাল ধরেই ইউরোপ পরিবারের ‘প্রবলেম চাইল্ড’। বলা চলে, দেনায় গলা পর্যন্ত ডুবে আছে দেশটি। সর্বশেষ গত সপ্তাহে এই গ্রিস আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফের) ঋণের ১৬০ কোটি ইউরোর কিস্তি দিতে ব্যর্থ হয়ে ঋণ-খেলাপি দেশে পরিণত হয়েছে। উন্নত বিশ্বের কোনো দেশের এমন ঋণখেলাপি হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম। একই সাথে গ্রিসের জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক উদ্ধার প্যাকেজের (বেইলআউট) চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ফলে সঙ্কটের শেষ কিনারায় দেশটি।

 
হাজার হাজার কোটি ইউরোর দেনায় ডুবে থাকা গ্রিসের জন্য এখন নতুন করে কোথাও থেকে ঋণ পাওয়া সহজ হবে না। বিভিন্ন হিসেবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে গ্রিসের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩২৩ বিলিয়ন ইউরো। এর মধ্যে তারা ৬০ শতাংশ ঋণ নিয়েছে ইউরোজোনের দেশগুলো থেকে। আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে মোট অর্থের ১০ শতাংশ। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছে ৬ শতাংশ ঋণ। ১৫ শতাংশ আছে বন্ড থেকে। বাকি ৯ শতাংশ গ্রিসের নিজস্ব ব্যাংক, বিদেশি ব্যাংক ও অন্যান্য ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের।
 
গ্রিস সরকারের ঋণ সংকট-গ্রিক মন্দা হিসেবেও পরিচিত। গ্রিসের এ অবস্থা একদিনে হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, বহু বছর ধরেই গ্রিসে সুশাসনের অভাব প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সুশাসনের অভাব আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। গ্রিসের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সংকট তৈরির আগে বেশ কয়েক বছর ধরে গ্রিস অপব্যয়ী অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করে আসছে। ২০০৪ সালে অলিম্পিক গেমস আয়োজনে দুই হাতে অর্থ ব্যয় করেছে কিন্তু সেখান থেকে তেমন রিটার্ন আসেনি।
 
গ্রিসের সরকার সরকারি খাতের আকার ক্রমাগত বাড়িয়ে গেছে; অথচ আয়কর আদায়ের দিকে লক্ষ্য রাখেনি। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য হয়ে যায়। সর্বোপরি যখন মন্দা অর্থনীতিকে আঘাত করতে শুরু করে তখনও গ্রিসের সংকট মোকাবেলার জন্য কোন আয়োজন ছিল না। তারা মনের সুখে ব্যয় করে গেছে। তারা ভেবেছে তারা সংকটে পড়লে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার তাদেরকে সাহায্য করে যাবে। সরকারি ব্যয়ের উচ্চহারের কারণে মুদ্রাস্ফীতি ছিল সর্বোচ্চ; প্রায় শতকরা ১২ শতাংশ। অথচ ইউরো জোনে মুদ্রাস্ফীতির মাত্রা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, শতকরা ৩ শতাংশ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি মানা যাবে। এক্ষেত্রেও গ্রিস ব্রাসেলসকে ফাঁকি দেয়। ধোঁকাবাজি করে রাষ্ট্রীয় বুককিপিং বা হিসাবরক্ষণ প্রণালী ঠিকঠাক আছে দেখিয়ে গ্রীস বেশ ভালভাবেই চালিয়ে যাচ্ছিল।
 
সাধারণত ভাবা হয় বৈশ্বিক মন্দার কারণেই আজ গ্রিসের এই অবস্থা। তবে এটাই গ্রিসের সংকটের মূল কারণ নয়। গ্রিসের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত দুর্বলতাও একটি বড় কারণ। যাকে সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। ২০০৯ সালের শেষদিকে ঋণ ও ঘাটতির বিষয়ে সরকারের কিছু অসত্য তথ্য-উপাত্ত প্রদানের বিষয়টি প্রকাশ হলে ঋণ শর্ত পূরণে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্যোগ তৈরি করে। এর ফলে আস্থার সংকটও প্রকট হয়।
 
অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কায় গ্রিসের অর্থনীতি এতটাই শোচনীয় অবস্থায় দাঁড়িয়ে যায় যে ২০১০ সালে ঋণের পরিমাণ দেশের মোট জিডিপির ১৪৬ শতাংশে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় দেউলিয়ত্বের মুখে পড়ে দেশটি। এ সময় ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ গ্রিসের সহায়তায় এগিয়ে আসে। এসব প্রতিষ্ঠান গ্রিসকে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করতে ওই বছরের ২ মে ১১০ বিলিয়ন ইউরো আর্থিক উদ্ধার প্যাকেজ (বেইলআউট) দেয়। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে এই ঋণ দেয়া হয়। যদিও কৃচ্ছ তাসাধন, কাঠামোগত সংস্কার, সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণসহ কয়েকটি শর্ত দেয়া হয় ঋণদাতাদের পক্ষ থেকে। এক বছর পর, এসব শর্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আবারো চরম সংকটের মুখে পড়ে গ্রিস। এ কারণে দ্বিতীয় দফায় আরো ১৩০ কোটি ইউরো ঋণ করে গ্রিস। এরপর তৃতীয় ও চতুর্থ দফায়ও বিরাট অঙ্কের অর্থ ঋণ নেয় গ্রিস। কিন্তু তারপরও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি গ্রিসের অর্থনীতি। বরং গ্রিসের উত্পাদন কমেছে ব্যাপকহারে। বেকারত্বের হার বেড়েছে, ন্যূনতম মজুরিও  ছাঁটাই হয়েছে। অর্থনৈতিক এ বিপর্যয়ের পেছনে বিশ্বব্যাপী মন্দাকে এক নম্বরে দায়ী করা গেলেও অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয়, নীতি-নির্ধারণী কিছু ভুল পদক্ষেপ গ্রিসের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী।
 
সর্বশেষ বেঁধে দেয়া সময়ে তারা আইএমএফের ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। ঋণদাতাদের আর্থিক উদ্ধার প্যাকেজের (বেইলআউট) চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। নতুন করে দুই হাজার ৯১০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা চাইলেও তাতে সাড়া মেলেনি। নতুন করে ঋণ চাওয়ার পাশাপাশি ঋণ পুনর্গঠনও চাইছেন সিপ্রাস, যে বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয় ঋণদাতারা। সংকট দেশের নাগরিকদের এমন ত্যক্তবিরক্ত করেছে যে কোন প্রকার কঠোর নীতি আরোপ করা হলে সার্বিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এ কারণে ঋণদাতাদের শর্তও মানতে রাজি নন দেশটির বামপন্থী সরকার। শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত জনগণের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার দেশটিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
 
প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাসের বামপন্থী সিরিজা পার্টি ক্ষমতা দখলের পর থেকেই জার্মানিসহ আরো বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ এথেন্সের ওপর অসন্তুষ্ট। অর্থনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে দীর্ঘদিন থেকেই গ্রিসকে ঋণের মাধ্যমে অর্থসহায়তা দিয়ে আসছে জার্মানি। তা সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে দেশটিতে অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেয় জার্মান সরকার।
 

দক্ষিণ ইউরোপের এ দেশটির বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশেষ করে জার্মানি এবং আইএমএফ এগিয়ে এসেছে। না এসে কোন উপায়ও নেই। কারণ গ্রিস ডুবলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিপদ। বিপদ আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও। বিভিন্ন দেশের ব্যাংক গ্রিস সরকার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দিয়েছে। গ্রিস এ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে এগুলো দেউলিয়া না হয়ে গেলেও সারা বিশ্বে একটা বার্তা যাবে যে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশও দেউলিয়া হতে পারে। এ বার্তা বিশ্বকে সংকটের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। গ্রিস দেউলিয়া হলে সব ব্যাংক ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সাবধান হয়ে যাবে। নিজেদের বাঁচাতে অনেক ব্যাংক ঋণ আদান-প্রদান বন্ধ করে দিবে। গ্রিসের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটছে। বর্তমান সংকটাবস্থা থেকে গ্রিস কীভাবে বেরিয়ে আসে এখন সেটাই দেখার বিষয়।