সৈকতে ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৫, ০১:৫১

সার্ফিং মানে ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ। বড় বড় সব ঢেউকে জয় করে যেই এগিয়ে যেতে পারবে সেই হবে জয়ী। বেেঁচ থাকা মানেই সংগ্রাম করা যেনো প্রতিমুহূর্তে আচমকা আসা ঢেউগুলোকে পাড়ি দিয়ে যেতে হবে বহুদূর। আর সার্ফিং খেলাটাই জীবনযাত্রার সাথে মিল সবসময়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে সার্ফিংয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের। এখানকার প্রায় কয়েকশ ছেলে-মেয়ে সার্ফিং করছে সমুদ্রে।

 
পুরুষতান্ত্রিক সমাজেও সার্ফিংয়ের মতো খেলায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে মেয়েরা। তারা প্রমাণ করছে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একটু সমর্থন পেলে ছেলেদের মতো তারাও পারে। সৈকতে তরুণীদের সার্ফিংয়ের প্রতি আগ্রহ ও সার্ফিংয়ের সফলতা দেখে সেটাই মনে হয়। ইতোপূর্বে মার্কিন নাগরিক ভেনেসা রিউড এবং তার স্বামী কক্সবাজারের সার্ফার রাশেদ আলমের প্রচেষ্টায় সমুদ্র সৈকতে কমবয়সী ছেলে-মেয়েদের সার্ফিয়ের এই প্রচেষ্টা এগিয়ে চলছে। তাদের এই প্রচেষ্টার আদ্যোপ্রান্ত এবং তরুণ-তরুণীদের নিয়ে তাদের আশা-আকাঙ্কা যেনো সফলতাই এনে দিয়েছে শেষ পর্যন্ত। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বাংলাদেশ সার্ফিং ফেডারেশন আয়োজিত টুর্নামেন্টে তরুণ-তরুণীরা অংশগ্রহণ করে বড় ধরনের সফলতা দেখিয়েছে গতবছর। এর মাধ্যমে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তাও পেয়েছেন তারা।
 
বর্তমানে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্রতিদিনই সুইমিং জোনে সার্ফিংয়ে ব্যস্ত থাকেন সার্ফাররা। সার্ফিং করে কক্সবাজারেরই অনেক তরুণ-তরুণীদেরদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। আজ সার্ফার জাফর সারাবিশ্বে পরিচিত। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে যেনো নয় ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়েই জাফর আজ বাংলাদেশের প্রথম সার্ফার। আজ শুধু জাফর নয় রাশেদ, রমজানরাও সারাবিশ্বে পরিচিত আর ইয়াসমিনরা তো বিশ্বটা হাতের মুঠোয় নেয়ার স্বপ্নে বিভোর। মূলতঃ ২০০৯ সালে কক্সবাজারে ভেনেসা রিউড এবং রাশেদ আলম কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের সার্ফিং এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রশিক্ষণ শুরু করেন। সমুদ্র সৈকতে লাইফ সেভিং অ্যান্ড সার্ফিং ক্লাবও গড়ে তোলেন তারা। বিভিন্ন সমপ্রদায়ের বাধা সত্ত্বেও তারা মেয়েদের জন্য বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। যেখানে দেশের  শতকরা ৪০ ভাগ মেয়ে এসএসসি পাস করে এবং পাঁচ বছর থেকে পনেরো বছরের ৪৯ লাখ মেয়ে শিশু শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। সার্ফিং ক্লাব এবং স্কুল তাদের শিক্ষার দিকে এগিয়ে নিচ্ছে এবং তাদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন করছে। একটা সময় যারা সমুদ্র সৈকতে কাজ করতো পানি, চিপস এবং ডিম বিক্রি করতো। তাদেরই সার্ফিংয়ে আসার জন্য উত্সাহিত করা হয়েছে। যদিও এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের মা-বাবা। কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল আয় করা। দুই ঘণ্টা সার্ফিংয়ে সময় দেওয়ার চেয়ে মা-বাবারা দুই ঘণ্টার আয়কেই বড় করে দেখেন। নারীদের সার্ফিংয়ের আগ্রহের ব্যাপারে ভিআর মনে করেন- বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এটা পুরুষদের দুনিয়া। একজন নারী হয়ে নিজের থেকে কিছু করা এবং তাও আবার পানিতে খুব স্বাভাবিক কাজ নয়। সার্ফিংয়ের মতো কাজে তাদের অভিভাবকরা বাধা দেন। এছাড়া পুরুষদের দ্বারা বিরক্ত করা এবং হয়রানি করার ব্যাপারটা তো আছেই। শুরুতে রাশেদ ও ভিওআর সৈকতের নিকটবর্তী একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে প্রথমে ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন ছবি দেখিয়ে এবং আস্তে আস্তে ইংরেজি শিখানোর কাজটি শুরু করেন। এসময় ভিওআর কথা বলতো এবং রাশেদ তা বাংলায় বলে বুঝিয়ে দিতো। এরপর প্রতিদিনই আগ্রহীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
 

এখন ছেলে-মেয়েরা অনেক কিছু শিখেছে। তারা ইংরেজী জানে এবং লিখতে ও বলতে পারে। এর আগে তারা কখনো শিখেনি এবং তাদের মা-বাবারাও সেটা চাননি। কিন্তু কেবল মা-বাবা নয়, আরো অনেকে তাদের শিখাতে চান। তারা বুঝতে শিখেছে যে তারা কিছু একটা করতে পারে। রাশেদের মতে, যখন আমরা প্রথম তাদের পানিতে নিয়ে আসি, তখন তারা তেমন দৃঢ় ছিল না। কিন্তু এখন তারা অনেকটা দৃঢ় ভূমিকায় এসেছে। যেই যুবকরা চাইতো না মেয়েরা সার্ফিংয়ে আসুক আজ সেই যুবকরাই মেয়েদের উত্সাহিত করছে। তারা মেয়েদের সম্মান করতে শিখেছে। অন্যদিকে সমুদ্র সৈকতে মেয়েরা দলবদ্ধ হয়ে যেকোন বিষয় মোকাবেলা করতে শিখেছে। সার্ফিংয়ের বিষয়ে কেউ যদি তাদের কিছু বলে তারা ঘোরে তাকায় এবং কিছু একটা করে। তারা মানুষের কাছে এখন একটি ছোট্ট বাঘের মতো এবং তারা প্রত্যেকে প্রত্যেককে রক্ষা করে। তারা সবাই একত্রে বেড়ে উঠেছে। তারা শিখেছে সার্ফ বোর্ডে কিভাবে তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলবে। মেয়েরা স্কেটিং করছে, সার্ফিং করছে, শিখছে, তারা নিজেদের জীবন নিজেরাই রক্ষা করছে। যদি এসব ছেলে-মেয়েদের সার্ফিংয়ে ব্যস্ত রাখা যায় এবং তারা যদি সার্ফিংয়ের জন্য স্পন্সর পায় তাহলে তারা অনেক দূর আগাতে পারবে। আর তাদের এই প্রচেষ্টা তাদের পরিবারের স্বপ্নেও একদিন পরিবর্তন ঘটাবে সেটাই প্রত্যাশা ক্ষুদে সার্ফারদের। খেলাটি ক্রিকেটের মতোই একদিন জণপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা সকলের।