সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত রাষ্ট্রগুলোর জন্য ‘ব্লু ইকোনমি’ এক নূতন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করিয়াছে। এই অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হইল মত্স্য ও জ্বালানি খনিজ সম্পদ আহরণ। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে প্রথমে মিয়ানমার এবং পরে ২০১৪ সালে ভারতের সহিত সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। ইহাতে ১ লক্ষ ১৮ হাজার ১৮৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার ওপর আমাদের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহার মাধ্যমে চট্টগ্রাম উপকূল হইতে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে অবস্থিত সকল প্রকার প্রাণিজ ও খনিজ সম্পদের উপর আমরা একচ্ছত্র মালিকানা লাভ করি। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, মিয়ানমার ও ভারত তাহাদের নিজ নিজ সমুদ্রসীমায় গবেষণা ও দক্ষ জনবলের মাধ্যমে জ্বালানি অনুসন্ধান ও মত্স্য আহরণ শুরু করিলেও আমরা আজও ইহার সদ্ব্যবহারে সক্ষম হই নাই। আমরা এখনো কেবল গবেষণা পর্যায়েই রহিয়াছি।
আমাদের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট’ নামে চলমান গবেষণা কার্যক্রমে দেখা যায়, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানায় এই পর্যন্ত সর্বমোট ৪৩০ প্রজাতির আহরণযোগ্য মাছের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। পাওয়া গিয়াছে ১৭ জাতের আহরণযোগ্য সামুদ্রিক চিংড়ির সন্ধান। এই প্রকল্পে আগামী জুন মাস হইতে যুক্ত হইবে গবেষণা জাহাজ ‘আরভি মীনসন্ধানী’ এবং ইহাতে আহরণযোগ্য আরও অনেক প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের সন্ধান পাওয়া যাইবে বলিয়া আশা করা যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক পরিসংখ্যান মতে, বঙ্গোপসাগর হইতে বত্সরে ৮০ লক্ষ টন মাছ ধরা হইলেও বাংলাদেশ ধরিতে পারিতেছে মাত্র ৯৫ হাজার টন। বাকি মাছ ধরিতেছে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভারতসহ আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলির জেলেরা। তাহার কারণ দেশের ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসীমার মধ্যে মাছ ধরিবার সীমা ৩৭০ কিলোমিটার হইলেও বাংলাদেশের জেলেরা যাইতে পারিতেছে মাত্র ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এইজন্য যে দক্ষ জনশক্তি, উন্নত মানের সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি দরকার, তাহা আমাদের নাই। প্রায় সাড়ে চারশত প্রজাতির মূল্যবান মাছ রহিয়াছে বঙ্গোপসাগরে। রহিয়াছে ইউরেনিয়ামসহ মূল্যবান বহু খনিজ পদার্থ এবং সিমেন্ট বানানোর উপযোগী প্রচুর ক্লে ও জীবন রক্ষাকারী ঔষধের অফুরান উত্স। এই কারণে শুধু মত্স্য আহরণই নহে, সামগ্রিকভাবে ব্লু ইকোনমিকে আমাদের দ্রুত কাজে লাগানো দরকার।
পৃথিবীর দেশগুলি তাহাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ চাহিদা মিটাইতে এখন তাকাইয়া আছে সমুদ্রবক্ষে সঞ্চিত সম্পদের দিকে। বর্তমানে বিশ্বের ৪৩০ কোটিরও বেশি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের জোগান দিতেছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তু। পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ আসিতেছে সমুদ্র তলের বিভিন্ন গ্যাস ও তৈলক্ষেত্র হইতে। এমনকি ইউরোপের উপকূলীয় দেশসমূহে এবং অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশেও ব্লু ইকোনমির উপর নির্ভরশীলতা দিন দিন বাড়িতেছে। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নতি লাভে ইহার প্রতি গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। ইহার হাত ধরিয়া বিকশিত হইতে পারে আমাদের পর্যটন খাতও। নবায়নযোগ্য ব্লু এনার্জি (বায়ু, স্রোত) উত্পাদন ও সমুদ্রবাহিত বাণিজ্যের মাধ্যমেও বিপুল অর্থনৈতিক অগ্রগতি লাভ করা সম্ভব। এইজন্য বন্দরের অবকাঠামোগত সুবিধার সমপ্রসারণ প্রয়োজন। তবে সবকিছুই করিতে হইবে সামুদ্রিক পরিবেশের কোনো প্রকার ক্ষতিসাধন না করিয়াই।
