জয়া ফারহানা
প্র্রথম সকালে ঈষত্ তপ্ত বাতাস। দুপুর ভর ঝাঁ ঝাঁ রোদ। দিন ভর চড়া রোদের সিসার দূষণ ছড়ানোর পর সন্ধ্যায় ফের স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে এই নগর। শাখা সড়কগুলোর অ্যাপার্টমেন্ট হাউসগুলোর খোলা বারান্দায় শেষ অপরাহ্নের দখিন হাওয়া। সন্ধ্যার নির্জনতায় শোনা যায়, নারকেল সুপারি পাতার মর্মর ধ্বনি। ফুটে থাকা নক্ষত্রের আলো যখন একে একে নিভে যেতে থাকে তখন আবার বাতাসে শেষ হয়ে আসা হিমের ছোঁয়া। আর ভোরের বাতাসের তো এমন মাহাত্ম্য যে, ঢাকার দূষিত আকাশও নির্মল হয়ে ওঠে। শীতে ফোটা হিমঝুরি ফুলগুলি সেই কবেই ঝরে গেছে। তবে এখনও রয়ে গেছে কুয়াশার নিবিড় আবরণ। ওয়্যারড্রোবে সদ্য তুলে রাখা কাশ্মিরি শালে হয়ত এখনও লেগে আছে দু’এক কণা শীত। যদিও ফাল্গুনে নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লাগা কেমন তা দেখার ভাগ্য আমাদের হয় না তবু ইট কংক্রিকেটের এই নগরে ভোরের বাতাসে শিরীষ, বকুল কিংবা আমের মুকুল এবং ভেসে আসা মঞ্জুরির মধু গন্ধই বা কম কী। বাড়ির পাশের কাঠচাঁপা কিংবা নিমফুলের মঞ্জুরিকে ঘিরে কোনো এক অলস ভ্রমরের নিমগ্নতা দেখতে পাওয়া সেও তো কম নয়।
মহাসড়ক ধরে যাত্রা শুরু করলে আশেপাশের কোনো গ্রামের লিচুগাছের ঘনপাতার আড়ালে কোকিলের পঞ্চম সুরও শোনা যাবে এখন। দেখা যেতে পারে উপচেপড়া তিল ফুল। তেলসুর বৃক্ষে মঞ্জুরিদের প্রাচুর্য। শীতের শুরুতে বৃক্ষ থেকে যে পাতারা ঝরে পড়েছিল বসন্তের মাঝামাঝিতে সেসব বৃক্ষে নামবে সবুজের ঢল। সব বৃক্ষেই এখন নিবিড় পত্রবিন্যাস তা বলা যাবে না। কিছু বৃক্ষের শাখা নিষ্পত্র। কিছু বৃক্ষের তল ঝরে পড়া বিবর্ণ পাতায় ঘেরা। কিছু বৃক্ষে উঁকি দিচ্ছে নবীন সবুজ পাতা। সেই নবীন সবুজ পাতা এবং ফুল ঘিরে রয়েছে চিরসঙ্গী প্রজাপতি, পতঙ্গ ও পাখি। প্রকৃতি এমন অসীম সুন্দর এমন প্রসন্ন। অথচ মুহূর্তেই সমস্ত অপ্রসন্ন হয়ে যায়। প্রসন্ন প্রকৃতির দিকে কি প্রশান্ত দৃষ্টিতে তাকানোর উপায় আছে ? এই চমত্কার রাত, দখিনা বাতাস, সুখশান্ত নির্জন অধ্যয়ন মুহূর্তে বিষণ্ন হয়ে যায়। কুপওয়ারার বোমা আর বারুদের গন্ধ আচ্ছন্ন করে ফেলে কাঠচাঁপার সৌরভ। করবে না-ই বা কেন ? ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণকণার সঙ্গে যেখানে মহাজগতের সম্পর্ক রয়েছে সেখানে আমরা মানুষ হয়ে কী করে ভুলে থাকি বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধের উত্তেজনা। বিশেষ করে যুদ্ধ যখন দূরের ইরাক, কাতার, সিরিয়া কিংবা ফিলিস্তিন নয়। সামান্য দূরের দক্ষিণ এশিয়ার আফগানিস্তানও নয় যুদ্ধ যখন একেবারে বাড়ির পাশের কুপওয়ারা কিংবা পুলওয়ামার দরজায় কড়া নাড়ে। অথচ এশিয়া থেকে ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে ল্যাটিন আমেরিকা, পৃথিবীর, এই ভূগোলের কোনো সাধারণ মানুষ যুদ্ধ চায় না। কেন চাইবে ? মানুষ তার মনের ভেতর স্বপ্নের ইট দিয়ে একটু একটু করে গেঁথে চলে যে জীবন, যুদ্ধে সে জীবন নিভে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাখি পতঙ্গ বৃক্ষ নদী মেঘ এদের যদি ভাষা থাকত তারাও চিত্কার করে বলত চাই না যুদ্ধ। তবে মুশকিল এই যে, যুদ্ধ বন্ধের প্রতিকার প্রার্থীরা অসহায়। আর যুদ্ধ বন্ধের জন্য সাধারণের ব্যাকুলতা পরাজিত হয় যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রনায়কদের যুদ্ধোন্মাদনার কাছে। খুনপিয়াসী মারণাস্ত্রের সামনে কিছুই যেন অপরিহার্য নয়। না শিশু না নারী না মাধুর্য না প্রকৃতি।
যুদ্ধে নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে সাধারণের অজ্ঞতা প্রায় শিশুর মতোই। যুদ্ধের সামনে আমরা সকলেই শিশুই তো। যুদ্ধ মুহূর্তে বুঝিয়ে দেয় এই পৃথিবী এই সভ্যতা এক জটিল ভুলের জাল। ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করতে কারো মনে পড়ে না। বেঠিক সময়ে বেঠিক বাসনা নিয়ে অস্থির হয়ে পড়ে। ইরাকের কাছে জীবাণু অস্ত্র আছে এবং অ্যানথ্রাক্স হামলার সঙ্গে সাদ্দাম হোসেন জড়িত- এ কথা ঘোষণা দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যার পর বুশ সাহেব বলেছিলেন ভুল হয়ে গেছে। সাধারণ এবং সৃজনশীল মানুষ সবসময় যুদ্ধের বিপক্ষে। তাই টলস্টয় লেখেন ‘ওয়্যার এ্যান্ড পিস’, স্পিলবার্গ তৈরি করেন ‘সিন্ডার’স লিস্টে’র মতো চলচ্চিত্র। আবার রাষ্ট্রনেতাদের ভুল ইচ্ছা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলে রাষ্ট্রনেতাদের ইচ্ছায় নির্মিত হয় ‘উরি’র মতো উগ্র জাতীয়তাবাদী চলচ্চিত্র। আগ্রাসী জাতীয়তাবাদই যেন আজ বিশ্বনেতাদের কূটনীতির বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কারণে হ্যানয়ে ট্রাম্প-উন বৈঠক শেষ হয় কোনোরকম চুক্তি ছাড়াই। উত্তর কোরিয়ার দাবি অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হয় না যুক্তরাষ্ট্র আর উত্তর কোরিয়াও ঘোষণা দেয় না পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের।
‘দোস্ত ! তুমহারি রোটি হামারা গোস্ত, কুচ পরোয়া নেহি’ -আফগান পাঠানরা বিশ্বাস করে বন্ধু যদি কেবল শুকনো রুটি খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করে তারপরও কোনো সমস্যা নেই, আফগান তার গায়ের মাংস কেটে রুটি গোস্তের ব্যবস্থা করবে। ওমর খৈয়াম তার কবিতায় আফগানদের দর্শন বর্ণনা করেছেন এভাবেই। ভাবা যায় ! সেই আফগানরা দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধ করে চলেছে। কাদের বিরুদ্ধে সেটাও এখানে বিবেচ্য।
বিশ্বব্যবস্থা যে বিশ্ববাসীর জন্য করুণ এবং রক্তাক্ত হয়ে উঠছে এর জন্য কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। যুুদ্ধমান ভুক্তভোগী জাতি জনগোষ্ঠী জানে, যুদ্ধের পরিণতি কী। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াই যুদ্ধের শেষ পরিণতি। তবু কেন যুদ্ধ ? গ্রিক পুরাণ বলছে, পৃথিবীটা সৃষ্টি-ই হয়েছিল যুদ্ধ দিয়ে। গ্রিক দেবতা প্রমিথিউস স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে নিয়ে এসেছিলেন পৃথিবীর মানুষের জন্য। মানব সভ্যতা শুরু হয়েছিল আগুন দিয়ে কিন্তু একই সঙ্গে বয়ে এনেছিল যুদ্ধও। প্রমিথিউস এবং জুপিটারের যুদ্ধ। কিন্তু এ তো গেল পুরাণের কথা। বাস্তবে যুদ্ধ এসেছে ঔপনিবেশিক নির্মমতা এবং আধিপত্যবাদের অহংবোধ থেকে।
সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন, শুনেছি আফগান মেয়েরা ক্ষেতের কাজ খানিকক্ষণের জন্য ক্ষান্ত দিয়ে গাছের আড়ালে গিয়ে সন্তান প্রসব করে। আসন্ন প্রসবের জন্য আফগান বাহিনীও নাকি প্রতীক্ষা করে না। সে নাকি বাচ্চা কোলে করে একটু পা চালিয়ে আবার যোগ দেবে বাহিনীতে। পর্বতচারী আফগান নারী-পুরুষ না হয় যুদ্ধের সঙ্গে সমঝে নিয়েছে। কিন্তু বাংলা অঞ্চলের এই পাললিক মাটির পলিমাটির মতো মানুষেরা যুদ্ধকে ঘৃণা করে। ঘৃণা করে যুদ্ধের যে কোনো সম্ভাবনাকেও।
n লেখক :প্রাবন্ধিক
