দায়িত্বহীনতায় আর কত মৃত্যু!

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৯, ২১:১৭

কাজী আশফিক রাসেল

‘ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে ভদ্র পল্লিতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাবে না’ —পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের এই বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে লেখক বাংলার পিছিয়ে পড়া ও এগিয়ে থাকা দুটি গ্রামকে সুনিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন। একটি পদ্মার তীরবর্তী জেলেদের কেতুপুর গ্রাম, যেখানে জেলে-মাঝিরা তীব্র কষ্টে পীড়িত, অভাব-অনটনে জর্জরিত জীবনযাপন করেন;  অন্যটি দূরের গ্রাম, যেখানকার মানুষ ওই মানুষদের অবদানের সুবিধা নিয়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করে নির্বিঘ্নে স্বার্থপরের মতো ভালো থাকে। দেখে মনে হয়, ঈশ্বর যেন স্বয়ং ওই সমৃদ্ধরূপী তাদের ভদ্র পল্লিতে বাসা বেঁধেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অমর উক্তিটি  একবিংশ শতাব্দীতেও যেনো সত্য হয়েই রইলো।

একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্য পুরো জাতি যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, তখন ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা নামের জনপদটি এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এক অভিশপ্ত শ্মশানে পরিণত হয়। যেন উপমহাদেশে অতীতে প্রচলিত কুপ্রথা সতীদাহের মতো চিতার আগুনে ভস্মীভূত হয়ে কয়লায় পরিণত হয়েছে  অনেকগুলো তাজা প্রাণ। মাতৃগর্ভের সন্তানও সেই আগুনের লেলিহান শিখা থেকে মুক্তি পায়নি। মৃতের সংখ্যা ৭১ পেরিয়ে চকবাজারের চুড়িহাট্টা পরিণত হলো ধ্বংসস্তূপে। বাতাসে  পোড়া লাশের গন্ধ আর চারদিকে স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ একুশের শহীদদের শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শোকের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলো। সমগ্র বাংলাদেশ আজ শোকে মুহ্যমান।

চকবাজারের এই ভয়ানক অগ্নিকাণ্ডকে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো কোনো দুর্ঘটনার মতো মনে হলেও আমার মতে এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড। যা ঘটার পূর্বে কোনো পূর্বাভাস থাকে না সেটাকেই আমরা আকস্মিক ঘটনা বা দুর্ঘটনা হিসাবে ধরে নেই, সেক্ষেত্রে চকবাজারের বীভত্স ঘটনাটি ছিলো পূর্বঘোষিত বিপর্যয়। আমরা দেখেছি নিমতলী ট্রাজেডি, দেখেছি তাজরীন ফ্যাশন ট্রাজেডি। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশনে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ পোশাক শ্রমিক এবং ২০১০ সালের জুন মাসে পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিকের কারখানায় আগুন ধরে ১২৪ জন নিহত হয়েছিলেন। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর সরকার গঠিত কমিটির অগ্নিকাণ্ড রোধে ১৭ দফা সুপারিশের ১ নম্বর দফায় পুরান ঢাকাসহ আবাসিক এলাকাগুলো থেকে রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, কারখানা ও দোকান সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিলো। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে আরো অনেক, কিন্তু আমাদের চৈতন্যোদয় ঘটেনি।

 চকবাজারের অগ্নিকাণ্ড যে কারণেই ঘটুক না কেন এখানে রাসায়নিক পদার্থের গুদাম না থাকলে ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চয়ই এত ভয়াবহ হতো না। এই মর্মান্তিক হূদয়বিদারক ঘটনার জন্য আমি শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রকে দোষারোপ করবো না, কারণ এরকম ঘটনা সরকারের একার পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়, ব্যক্তি থেকে শুরু করে দায়িত্ব আছে সবার। তবে এ মর্মস্পর্শী ঘটনার জন্য প্রধান দায়ী আমাদের স্বার্থান্বেষী ও মুনাফালোভী অভিজাত সম্প্রদায়। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস এক সময় বলেছিলেন—যার টাকা আছে, তার জন্য আইন উন্মুক্ত আকাশের মতো, আর যার টাকা নাই, তার জন্য আইন মাকড়সার জালের মতো।  যা আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থার জন্য যুগোপযোগী। যেকোনো নির্মাণ কাজের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও এসবের তোয়াক্কা না করে দেশব্যাপী ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত স্থাপনা। ঝুঁকিপূর্ণ জানা সত্ত্বেও শুধুমাত্র মুনাফার লোভে আবাসিক এলাকায় ভাড়া দেওয়া হয় দাহ্য পদার্থের কারখানা। অবৈধভাবে চলে অভিজাত শ্রেণির রমরমা ব্যবসা। খেটে খাওয়া নিরীহ মানুষগুলোর জীবনের মূল্য নির্ধারিত হয় মুনাফার ভিত্তিতে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত মানুষগুলোকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়ে অভিজাত সমপ্রদায় নির্বিঘ্নে বাস করে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা সুরক্ষিত আবাসিক এলাকায়। সেই আদিকাল হতেই পৃথিবীর সর্বত্র শক্তিশালীর জয়জয়কার ছিলো। গরীবরা ছিলো নিগৃহীত, শোষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত।

প্রত্যেকটা মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর আমাদের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে থাকে অপরাধীদের ছাড় না দেয়ার প্রতিশ্রুতি। কিন্ত বাস্তবে বক্তব্য শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, অপরাধী প্রায়ই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

চকবাজারের এই লোমহর্ষক ঘটনার পর আমরা চাই না কারো অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, স্বেচ্ছাচারিতার দায়ে আর একটি জীবনপ্রদীপ নিভে যাক। অনেক সময় গড়িয়েছে, অনেক প্রাণ অকালে ঝরেছে, আর কালক্ষেপণ না করে এবার আশাকরি আমাদের নীতিনির্ধারকদের  ঘুম ভাঙবে।

n লেখক: শিক্ষার্থী,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।