গ্রামের মানুষ চাঁদা তুলে, নিজেদের শ্রম দিয়ে বাগেরহাট সদর উপজেলার গুজিহাটি ওয়াপদা রাস্তাটি সংস্কার করলেন। তরুণ থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই মিলে কোদাল হাতে নিয়ে বাঁশ দিয়ে পাইলিং করে রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করে তুললেন। কিন্তু সেই রাস্তাটিকেই পরে টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্কার দেখিয়ে লুট করে নেয়া হয়েছে ১৪ দশমিক ৩ মেট্রিক টন চাল।
ইত্তেফাকের এই প্রতিবেদক সম্প্রতি বাগেরহাটে উন্নয়ন বরাদ্দ পাওয়া বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে দেখেছেন— অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা চিত্র। ওই জেলায় শুধু স্বেচ্ছাশ্রমকে প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে নয়, টিআরের মাধ্যমে সোলার প্যানেল স্থাপনে হয়েছে নয়ছয়। যেসব ব্যক্তির বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে তাদের সবার বাড়িতেই রয়েছে বিদ্যুত্। আবার সোলার প্যানেল স্থাপনে উেকাচ নেয়ার অভিযোগও এসেছে। এ ছাড়াও সংসদ সদস্যের বিশেষ বরাদ্দের ক্ষেত্রে মানা হয়নি কোনো নিয়ম। পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে একাধিকবার বরাদ্দ। শুধু টিআর-কাবিখা বরাদ্দে নয়—অন্য উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভবন নির্মাণের আগেই ঘুষ লেনদেন করতে হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ কাজেও পাওয়া গেছে অনিয়ম। এই চিত্র শুধু বাগেরহাটের সদরের নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলার। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন— চাল, গম ক্রয়-বিক্রয়ের সময় এবার চরম দুর্নীতি হয়েছে। সোলার প্যানেল কেনার ক্ষেত্রেও হয়েছে দুর্নীতি। না কিনেই বিল-ভাউচার দিয়ে টাকা উঠিয়ে নেয়া হয়েছে।
‘স্বেচ্ছাশ্রম’ সরকারি খাতায় প্রকল্প
স্বেচ্ছাশ্রমে সংস্কার করা রাস্তাটি ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের টিআরের সাধারণ কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ওই প্রকল্পের সভাপতি হলেন জেলার সদর উপজেলার ১নং কাড়াপাড়া ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের সাধারণ সদস্য মো. আবু তাহের। কাড়াপাড়া ইউনিয়নের গুজিহাটি ওয়াপদা রাস্তা জাফরের বাড়ি থেকে লুত্ফরের বাড়ি পর্যন্ত স্বেচ্ছাশ্রমেই সংস্কার হয়েছে। যার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার করা হয়েছে— সেই লুত্ফুর ইত্তেফাককে জানালেন, দু মাস আগে আমাদের গ্রামের মানুষ ওই রাস্তাটি বাঁশ দিয়ে পাইলিং করেছেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচশ করে টাকা চাঁদা নিয়ে কেনা হয় ইট। গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে ওই ইট রাস্তাটিতে বিছিয়ে দেন। কিন্তু সরকারি খাতায় টিআর প্রকল্পে রাস্তা সংস্কার হয়েছে শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তিনি। ১৪ দশমিক ৩ মেট্রিক টন চাল রাস্তা সংস্কারের নামে যে বরাদ্দ হয়েছে—এ ধরনের কোনো তথ্য তাদেরকে কেউ জানায়নি। স্থানীয় গুজিহাটি জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি আবু নোমান তরফদার একই তথ্য দেন। তিনি জানান, স্বেচ্ছাশ্রমে ওই রাস্তাটি সংস্কার করা হয়েছে। গ্রামের প্রত্যেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কর্তৃক ধার্য করা চাঁদা পরিশোধ করেছেন। তা হলে বরাদ্দের চাল গেল কোথায়? এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে প্রকল্প সভাপতি ও ইউপি সদস্য মো. আবু তাহের বলেন, সরকারি টাকায় রাস্তা সংস্কার হয়েছে। গ্রামবাসীদের স্বেচ্ছাশ্রমের বিষয়টি সত্য নয় বলে তিনি দাবি করেন।
তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য মীর শওকত আলী বাদশা নিজেই ওই প্রকল্প সভাপতির কর্মকাণ্ডে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ওই ইউপি সদস্য জামায়াতের রাজনীতি ছেড়ে এখন আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন বলে শুনেছি। কিন্তু আমার কাছে আসার চেষ্টা করলেও তাকে কখনো পাত্তা দেইনি। ওই মেম্বার একটি মাদ্রাসার সুপার হলেও একদিনও ক্লাস না করে বেতন নেন। ফলে বরাদ্দের টাকা কী করেছেন তা আল্লাহ ভালো জানেন।
সোলার প্যানেল স্থাপনেও নয়ছয়
টিআর প্রকল্পের আওতায় সোলার প্যানেল স্থাপনেও নয়ছয় হয়েছে। সুনির্দিষ্ট একটি কোম্পানির মাধ্যমে ক্রয় করা হয়েছে সব সোলার প্যানেল। এগুলো পেয়েছেন বিদ্যুত্ আছে যাদের বাড়িতে তারাই। যাদের বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে সেখান থেকে উেকাচ নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। কাড়াপাড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মিঠাপুকুরের মোঃ জাহিদ ফকির, মির্জাপুরের এস্কান্দার শেখ, হানিফ ফকির, পারুল বেগম, গুজিহাটির আয়ুব আলী শেখের বাড়িতে সম্প্রতি ২০ ওয়াটের তিন লাইট বিশিষ্ট সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। অ্যাডভান্স সৌর বিদ্যুত্ নামের একটি কোম্পানি প্রতিটি ৮ হাজার টাকা ব্যয়ে ওই সোলার প্যানেল স্থাপন করে। গ্রামবাসীরা জানালেন, যেসব ব্যক্তির বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে তাদের সবার বাড়িতেই বিদ্যুত্ রয়েছে। অথচ বিদ্যুত্ থেকে বিচ্ছিন্ন বাসিন্দারা সোলার প্যানেল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ
বাগেরহাট সদরের হযরত ফাতেমা (রা.) কারিগরি মহিলা কলেজে সৌরবিদ্যুত্ স্থাপনের জন্য তৃতীয় পর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হলেও হাতেগোনা দু-একজন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে সেখানে। এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ স্থানীয় সংসদ সদস্যের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী। বাকি শিক্ষকরাও তার আত্মীয়। এমপির বিশেষ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সব সময় এই প্রতিষ্ঠানের নামে থাকবেই—এ কথা বললেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ বিষয়ে বাগেরহাট-২ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য মীর শওকত আলী বাদশা ইত্তেফাককে বলেন, নিয়ম মেনেই ওই প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়।
প্রকল্প শুরুর আগেই অর্ধেক টাকা নাই হয়ে যায়
কাজ শুরুর আগেই প্রকল্পের অর্ধেক টাকা নানাভাবে লোপাট হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জিএম সাইফুল ইসলাম জানান, টিআর-কাবিখার নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ১ম পর্যায়ের বরাদ্দকৃত চাল, টিআর-কাবিখার ১ম পর্যায়ের সাধারণ বরাদ্দকৃত গম, দ্বিতীয় পর্যায়ের বরাদ্দকৃত চাল ও গমের সরকারি মূল্য ও বাজার মূল্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। চালের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৮১ টাকা আর গমের ৩০ হাজার ৪০৭ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ওই চাল ও গমের মূল্য যথাক্রমে ১৫ হাজার ও ১২ হাজার টাকা। ফলে কোন প্রকল্প শুরুর আগেই অর্ধেক টাকা নাই হয়ে যায়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, প্রতিটি প্রকল্প পেতে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও প্রকল্প কর্মকর্তাকে উেকাচ দিতে হয়। এছাড়াও টিআর এবং কাবিখার চাল-গম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশীল সিন্ডিকেট। কম মূল্যে ওই সিন্ডিকেটের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে বিক্রি করতে হয় চাল-গম। ফলে সবশেষে এক টন গমের কোন কাজে তাদের হাতে পৌঁছে পাঁচ হাজার টাকার মতো। যা দিয়ে কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন কখনো সম্ভব হয় না। ফলে গ্রামীণ অবকাঠামোর জন্য সরকার যে উন্নয়ন বরাদ্দ দিচ্ছে বাস্তবে তার খুবই নগণ্য অংশ লক্ষ্যে পৌঁছায়।
ছাত্রী নিবাসের কাজ শুরুর আগেই ২৩ লাখ টাকা ঘুষ !
শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে সরকারি পিসি কলেজে ১শ’ আসন বিশিষ্ট একটি ছাত্রী নিবাস নির্মাণ করছে। এই নির্মাণ কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অগ্রিম ২৩ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ এসেছে। শিক্ষা প্রকৌশলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় মাত্র দু’টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে যৌথভাবে অংশ নেয়া এমএনএইচ এন্ড এমএমআর জে.ভি কনস্ট্রাকশন ফার্ম কাজটি পেতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এজন্য তাদের প্রভাবশালী মহলকে দিতে হয়েছে অগ্রিম ২৩ লাখ টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অগ্রিম টাকা দেয়ার বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি।
মহাসড়ক নির্মাণ কাজে নানা অনিয়ম
বাগেরহাটের সাইনবোর্ড থেকে বগী পর্যন্ত ৫৬ দশমিক ৬২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আঞ্চলিক মহাসড়কের নির্মাণ কাজে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারসহ সিডিউল অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শরনখোলায় বিক্ষোভ হয়েছে। এ সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি এলাকাবাসী স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. মোজাম্মেল হোসেনকে অবহিত করে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় এমপি জানান, এ মহাসড়ক নির্মাণে দুর্নীতি, অনিয়ম সহ্য করা হবে না। অনিয়ম হওয়ায় প্রথম যে প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছিল তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। নতুন আরেকটি প্রতিষ্ঠান এ মহাসড়কের বাকি কাজ শুরু করবে।
২০১০ সালে একনেকে সিডর ও আইলায় বিধ্বস্ত বাগেরহাটের সাইনবোর্ড-মোড়েলগঞ্জ-শরনখোলা উপজেলা সংযোগ সড়কটি আঞ্চলিক মহাসড়কে রূপান্তরিত করার প্রকল্প অনুমোদিত হয়। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৮৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এরপর পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ সড়কে দীর্ঘ ৫ বছরে কাজের অগ্রগতি বলতে ২৮টি কালভার্ট ও ৩টি ব্রিজ। এছাড়া সড়কে বালি ও কিছু কিছু স্থানে ইট দিয়ে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে কার্পেটিং হলেও তার মান নিম্ন। পুরনো সড়কের স্তর উঠিয়ে নিয়মানুযায়ী সাববেজ, মেকাডমের কাজ না করে এবং কার্পেটিং নির্ধারিত মাপের না করে দায়সারাভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে মহাসড়কের কাজ।
বর্তমানে মোড়েলগঞ্জ ও শরনখোলার দুটি অংশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় পিচ ঢালাই হলেও অধিকাংশ স্থানে ইটের খোয়া ফেলে রোলার করার কাজ চলছে। দুই উপজেলার সীমিত অংশ ছাড়া বাকি রাস্তার খুব নাজুক। খানাখন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে শতশত যাত্রীবাহী যানবাহন। এ সড়কের বকুলতলা অংশে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার জায়গায় লোকাল পাজার তিন নম্বর ইট ব্যবহার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে আউটসাইড পাইলিং টেকসই না করেই রাস্তা কার্পেটিং করা হয়েছে। যা ৪/৫ মাসের মধ্যেই দেবে যেতে পারে। এ ব্যাপারে বাগেরহাট জেলা সড়ক-জনপদ বিভাগের প্রকৌশলী মো. নাহিন রেজা ইত্তেফাককে বলেন, এ সড়ক নির্মাণ কাজে অনিয়ম হলে তদন্ত করে দেখা হবে। সড়কের কাজ নিম্নমানের হলে সংশ্লিষ্ট কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।