প্রতিবছর রমজানের সময় যাকাত দেয়ার সময় নানা ধরনের দুর্ঘটনার ঘটে। হুড়োহুড়ি করে যাকাতের কাপড় ও টাকা নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে। স্বাধীনতা পরবর্তীতে এদেশে এ ধরনের দুর্ঘটনায় শতাধিক হতদরিদ্রের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই বৃদ্ধা, নারী ও শিশু। দুর্ঘটনার পর নিহত ব্যক্তির পরিবারকে স্থানীয় প্রশাসন থেকে সামান্য কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। এসব ঘটনায় স্থানীয়ভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও একটির ঘটনায়ও কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বেশ কিছু সুপারিশ দিলেও তা কোন সময়ই বাস্তবায়ন বা অনুসরণ করা হয়নি। কোন নিয়ম-নীতি না মেনেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে যাকাত প্রদান করে আসছেন।
গতকাল শুক্রবার ময়মনসিংহে যাকাত ট্রাজেডির আগে দেশে বেশ কয়েকটি এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮০ সালে ঢাকার জুরাইনে যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ১৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ১৯৮৩ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যাকাতের টাকা নিতে গিয়ে ভিড়ের চাপে পড়ে ৩ শিশু মারা যায়। ১৯৮৭ সালের ২৩ মে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় সরকারিভাবে যাকাত প্রদানকালে ব্যাপক লোক সমাগম হয়। এক পর্যায়ে জনগণ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এসময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় মধ্যে পড়ে ৪ জন মারা যায়। ১৯৮৯ সালের ৫ মে চাঁদপুরে যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত মারা যায় ১৪ জন। এসময় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়। যাকাত নিতে গিয়ে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে চট্টগ্রামে। ১৯৯০ সালের ২৬ এপ্রিল পাহাড়তলীর আবুল বিড়ি ফ্যাক্টরিতে যাকাত নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ৩৫ জন নিহত হয়। এসময় আহত হয় দুই শতাধিক মানুষ। গত বছরের ২৫ জুলাই রমজানের ঈদের দুইদিন আগে মানিকগঞ্জের গার্লস স্কুল রোডে ব্যবসায়ী মাহবুব হাসান মোর্শেদ রুনুর বাড়িতে যাকাত প্রদানের সময় পদদলিত হয়ে জামেলা খাতুন ও হাসনা বেগম নামে দুই হতদরিদ্র নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। একই দিন বরিশালের কাঠপট্টি এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে যাকাত প্রদানের সময় হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে ফিরোজা ও নুপুর নামে দুই নারীর মৃত্যু হয়।
নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করেই যাকাত প্রদানের ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাকাত প্রদানের উদ্যোগ নিলে তা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারকে অবহিত করতে হবে। যাকাত প্রদানের দিন সেখানে পর্যাপ্ত পুলিশী নিরাপত্তা রাখতে হবে। যাকাত প্রদানের আগে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সেখানে যাকাত প্রদান করা যাবে কিনা-এ ব্যাপারে পুলিশ সুপারকে রিপোর্ট দিবে। পুলিশের এসব নিয়ম শুধু তাদের কাগজে-কলমে। বাস্তবে এর কোন প্রতিফলন নেই। এ কারণে প্রতিবছর যাকাত প্রদানের সময় পদদলিত হয়ে হতদরিদ্রদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক বলেন, যাকাত দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। অনুষ্ঠানের কমপক্ষে একদিন আগে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারকে বা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তথ্য প্রদানের সুযোগ রয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিরই দায়িত্ব রয়েছে। নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি তথ্য গোপন করা হলে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। সেজন্য তথ্য দিয়ে পুলিশি নিরাপত্তা সেবা গ্রহণের জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে।
