রাজবাড়ী প্রতিনিধি
গত সপ্তাহে বৃষ্টির পানিতে রাজবাড়ী জেলার পাঁচটি উপজেলার নিচু অঞ্চলে আবাদী জমিতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় তলিয়ে গেছে পেঁয়াজ ক্ষেত। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পেঁয়াজ চাষিরা। রাজবাড়ী সদর, বালিয়াকান্দি, কালুখালী, পাংশা ও গোয়ালন্দ উপজেলার নিচু অঞ্চলের জমির পানি নিষ্কাশন হয়ে খালে না যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে।
রাজবাড়ী কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ২৭ হাজার ৩২৩ হেক্টর জমির পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও ২৮ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার মাশালিয়া মাঠের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত খালে বাঁধ নির্মাণের ফলে কৃষকের পেঁয়াজ ক্ষেতে আটকে থাকা পানি সরছে না। অন্যদিকে জেলার বেশ কিছু অঞ্চলে কৃষকেরা নিজ ব্যবস্থাপনায় শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে জমির পানি নিষ্কাশন করছে। অনেক কৃষক মুড়ি পেঁয়াজ পাকার আগেই পচে যাওয়ার ভয়ে ঘরে তুলছে। কৃষক মোঃ কালাম মন্ডল জানান, হঠাত্ করেই টানা বর্ষণে আমার পৌনে দুই একর জমির প্রায় এক একর জমি পানির নিচে চলে গেছে। জমি থেকে খালের দূরত্ব ২০০ মিটার হলেও জমির পানি সরছে না।
এলাকার বাসিন্দা শামসু মোল্যা বলেন, ‘খালে বাঁধ নির্মাণের কারণে পানি প্রবাহ বন্ধ। আমরা চারদিন ধরে বিভিন্ন জমিতে মাঝখান দিয়ে ক্যানেল করে ২০টি শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে পানি নিষ্কাশন করে যাচ্ছি।’
বালিয়াকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ নায়েব আলী বলেন, ‘রাজবাড়ীতে এবছর পেঁয়াজ চাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি আমার ব্যক্তি উদ্যোগে পানি নিষ্কাশনের জন্য যত শ্যালো মেশিনের তেল দিয়ে সাহায্য করে যাচ্ছি।’
বালিয়াকান্দির উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘গত সপ্তাহে হঠাত্ করেই বৃষ্টিতে ক্ষেতের পেঁয়াজ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টির কারণে ৪০ শতাংশ ফলন কম হবে।’
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মোঃ ফজলুর রহমান বলেন, ‘বৃষ্টিতে মোট কি পরিমাণ পেঁয়াজের ক্ষেত ক্ষতি হয়েছে, সেটা জানতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে। আমরা কৃষকদের পানি নিষ্কাশনসহ জমিতে যেন ইউরিয়া সার প্রয়োগ না করে সেই পরামর্শ দিয়েছি।’
জেলা প্রশাসক মোঃ শওকত আলী বলেন, ‘স্থানীয় কৃষকরা পেঁয়াজের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অভিযোগ করলে আমি খালের বাঁধসহ স্লুইস গেটের ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’
দিনাজপুরে পেঁয়াজের দাম
কম থাকায় হতাশ কৃষকরা
দিনাজপুর অফিস জানান, দিনাজপুরে ১৩টি উপজেলায় পেঁয়াজের ভালো ফলন হলেও মণপ্রতি ঘাটতি যাচ্ছে ১৫০ টাকা। ফলে পেঁয়াজ নিয়ে হতাশায় পড়েছেন চাষিরা। তারপরও পেঁয়াজ তুলতে ব্যস্ত চাষিরা।
পেঁয়াজ উত্তোলন ও বাজারজাত করতে শত শত শ্রমিক কাজ করছেন। উত্তর কোতোয়ালির চাষি মো. হাসান আলী জানান, বিভিন্ন এনজিও ও মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ আবাদ করেছি। পেঁয়াজ তুলে তাদের টাকা পরিশোধ করার জন্য মাঠ থেকে পেঁয়াজ তুলছি। গত সপ্তাহে রাণীগঞ্জ হাটে প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকায়। কিন্তু প্রতিমণ পেঁয়াজের গড় উত্পাদন খরচ হয়েছে ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা।
দক্ষিণ কোতোয়ালির রুহুল আমিন জানান, চলতি মৌসুমে আমার ১০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ উত্পাদন খরচ হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে দেড় বিঘা জমির আগাম জাতের পেঁয়াজ উঠানো হয়েছে। প্রতিমণে ৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা ঘাটতি হচ্ছে। সার ও কীটনাশক এবং ওষুধের দাম আগের চেয়ে বেশি। গোপালগঞ্জ পেঁয়াজ চাষি মো. মান্নান জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর ১৬ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছি। এবার বাম্পার ফলন হয়েছে, কিন্তু দাম অনেক কম। খরচ উঠছে না।
দিনাজপুর বাহাদুর বাজার ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেন জানান, মোকামে পেঁয়াজের যথেষ্ট চাহিদা আছে। স্থানীয় বাজারে পাইকারি ক্রেতার সংখ্যা কম। সরকার যদি এলসি ও ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি না করে তাহলে চাহিদা ও দাম থাকবে। রেল হাটের ব্যবসায়ী জাহিদ জানান, ঢ্যামনা ও চারা পেঁয়াজ নামে দুই ধরনের পেঁয়াজ এলাকায় চাষ হয়ে থাকে। চারার পেঁয়াজ দীর্ঘ সময় মজুদ রাখা যায়। পেঁয়াজ আবাদ হয় কম বেশি দিনাজপুর ১৩টি উপজেলাতে। এ ধরনের পেঁয়াজের বাজার থাকলে আগামীতে উত্পাদনে মনোযোগী হবে না দিনাজপুরের চাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. তহিদুল ইকবাল জানান, চলতি মৌসুমে ৭০৩ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল সাত হাজার ১৪৪ হেক্টর। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করবে।
