আসন্ন রোজার ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি এবার অন্যান্য বারের চেয়ে তুলনামূলক কম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মহাসড়কগুলোতে কিছু খানাখন্দ থাকলেও তা মেরামতের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। তবে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ কয়েকটি মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ ও কোথাও কোথাও ফ্লাইওভারের কাজ চলায় কিছু স্থানে যানজটের ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে। এটিকে ‘উন্নয়নের দুর্ভোগ’ বলে মনে করছে সরকার। তবে যাত্রীরা যেন স্বস্তিতে ঘরে যেতে এবং ঈদ শেষে নিরাপদে কর্মস্থলে ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যে হাইওয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট মহানগর পুলিশকে তত্পর রেখেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
শুধু ঈদে নয়, মহাসড়কগুলো বছরজুড়ে যান চলাচলের উপযোগী রাখতে সরকার বা মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপই নেয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দও দেয়া হয়েছে। এরপরেও কোথাও কোথাও যে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে এর মূল কারণ ঠিকাদার ও মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খামখেয়ালিপনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের ‘অনৈতিকতা’ও দায়ী।
বিশেষ করে বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের সময় উপযুক্ত উপাদান ব্যবহার না করার ফলে মহাসড়কগুলোর অনেক স্থান টেকসই হচ্ছে না। দরপত্রের মাধ্যমে কার্যাদেশ পাওয়ার পর সেটি নিয়েও ঘটে নানা ঘটনা। অনেক সময় দেখা যায়, মূল ঠিকাদারের পরিবর্তে কাজ করছে অনভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তি। এছাড়া সড়কগুলো সঠিকভাবে মনিটরিং ও সময়ে-সময়ে মেরামত করা হয় না। কোনো কোনো সড়ক ভাঙাচোরা হয়ে গেলেও মাসের পর মাস অযত্নে পড়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক কর্মকর্তারা তা তদারকি তো করেনই না, এমনকি মন্ত্রণালয়কেও সঠিক সময়ে তা অবহিত করেন না। ফলে শেষ পর্যন্ত এর বদনাম বা দায়ভার সরকারকেই বহন করতে হয়।
এবারের রোজার ঈদে মহাসড়কে যানজট ও দুর্ভোগ হবে না বলে দাবি করছেন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি ইত্তেফাককে জানান, মহাসড়কগুলো যান চলাচলের উপযোগী রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং টিমগুলো সড়ক মেরামত কাজের নিবিড় তদারকি করছে। আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস, এবারও মানুষ ঈদে স্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে এবং উত্সব শেষে কর্মস্থলে ফিরে আসতে পারবে। তিনি জানান, ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদে বাড়ি ফেরা, ঢাকা মহানগরী থেকে বহির্গমন সড়কগুলো যানজটমুক্ত রাখা, মহাসড়কে যানজট মোকাবেলা, সড়ক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়ে মন্ত্রণালয় সক্রিয় রয়েছে। সড়ক ও জনপথের প্রকৌশলীদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, ঈদে দেশবাসীকে নিরাপত্তা দিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট তত্পর। ঈদকে সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যা যা করণীয় সব করছে। হাইওয়ে ও মহানগর পুলিশ কাজ করছে। মহ?াসড়কে যেন যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে না হয়, সে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। এছাড়া ছিনতাই ও মলম পার্টি নিয়ন্ত্রণেও কাজ করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে কোথাও কোথাও উন্নয়নকাজ চলার কারণে এবারও সাময়িক অসুবিধা হতে পারে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়নের সঙ্গে যানবাহনও বাড়ছে। বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ হচ্ছে। তবে ঈদকে সামনে রেখে গাড়ি নিয়ন্ত্রণেরও নানাবিধ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’
‘উন্নয়নের দুর্ভোগ’
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঢাকা থেকে ফেনীর মহিপাল পর্যন্ত যাতায়াত করে দেখা গেছে, এই মহাসড়কে এবার তুলনামূলকভাবে খানাখন্দ কম। তবে মহাসড়কের কুমিল্লা থেকে ফেনী পর্যন্ত অংশে নির্মাণাধীন দুটি উড়ালসড়ক ও একটি সেতু মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা ঈদ উদযাপনে ঘরমুখী মানুষের যাত্রায় ভোগান্তি দিতে পারে।
ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত মহাসড়ক আট লেনের। এরপর থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত চার লেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন করার কাজ শুরু হয়েছে দাউদকান্দি টোল প্লাজার পর থেকে। ইলিয়টগঞ্জে একটি সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। যানজট না হলেও গাড়ির গতি কিছুটা কমে আসে। ইলিয়টগঞ্জে নির্মাণাধীন সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৯ মিটার। দুই বছরে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত মাত্র ৫৪ শতাংশ কাজ হয়েছে।
ইলিয়টগঞ্জ থেকে চান্দিনা ও ময়নামতি হয়ে পদুয়ার বাজার পর্যন্ত কিছু কিছু স্থানে ছোট ছোট গর্ত থাকলেও সেগুলোর মেরামতের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কুমিল্লা বিশ্বরোড পার হয়ে পদুয়ার বাজারে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫০ মিটার, কাজ হয়েছে ৭২ শতাংশ। পদুয়ার বাজার ফ্লাইওভারের পর থেকে মহাসড়কে মহিপালের আগ পর্যন্ত দেখা গেছে কার্যত ‘ঢেউখেলানো’ সড়ক। মহাসড়কের দুই পাশ ঘেঁষে যে নিশানা ধরে যান চলে, সেই পথে লম্বালম্বি উঁচু-নিচু পথ তৈরি হয়েছে। এতে যানবাহন ডানে-বামে সরাতে বিপত্তিতে পড়েন চালকেরা। ফেনীর ফতেহপুরেও একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে। এই সেতুর দৈর্ঘ্য ৮৬ মিটার, এ পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৪২ শতাংশ।
চার লেনের ১৪২ কি.মি. অংশ উন্মুক্ত হচ্ছে
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১৪২ কিলোমিটার অংশ চার লেন হয়েছে। তবে এর বেশিরভাগেই সড়ক বিভাজক তৈরি হয়নি। ফলে মাঝখানে বৃষ্টির পানি জমে তৈরি হওয়া কাদা সড়কে চলে আসছে। এই প্রকল্পের পরিচালক ইবনে আলম হাসান জানান, নতুন যে ১৪২ কিলোমিটার সম্পন্ন হয়েছে, ঈদে এর পুরোটিই যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে।
কুমিল্লা প্রতিনিধি মো. লুত্ফুর রহমান জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে কুমিল্লায় মহাসড়কের ১০৪ কিলোমিটার অংশে বৃহস্পতিবার থেকে কুমিল্লা জেলা ও হাইওয়ে পুলিশের সাড়ে ৪শ’ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মহাসড়কে যে কোনো সমস্যা দ্রুত নিরসনে পুলিশের ৬০টি ভ্রাম্যমাণ টিম মোটর সাইকেলযোগে দায়িত্ব পালন করবে। সড়ক দুর্ঘটনায় তাত্ক্ষণিক উদ্ধার কাজের জন্য মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ৭টি র্যাকার মজুদ রাখা হয়েছে।
সীতাকুন্ড-মিরসরাইয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে শঙ্ক
চট্টগ্রাম অফিস থেকে সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ জানান, ঈদে চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘরমুখো যাত্রী নিয়ে সড়কপথে যাত্রী পরিবহনকারী সংস্থাগুলো সীতাকুন্ড ও মিরসরাই উপজেলার ৬টি পয়েন্টে ভয়াবহ যানজটের আশঙ্কা করছেন। মহাসড়কের ভাটিয়ারি, সলিমপুর এবং বন্দরের টোল সড়কের তেমোহনা সংযোগকে যানজটের অন্যতম পয়েন্ট বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের সীতাকুন্ড-মিরসরাই অংশের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাসুদ করিম ইত্তেফাককে বলেন, বৃষ্টি না হলে ঈদে যাত্রী পরিবহনে চার লেন ব্যবহার করা যাবে। কারণ বৃষ্টিতে রাস্তার নির্মাণাধীন অংশে পানি ঢুকে প্রেশার সৃষ্টি করে গাড়ির চাকার চাপে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়।
প্রশস্ত হয়েছে ১১ বাঁক
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা বাবুল আকতার মঞ্জুর জানান, নবীনগর থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত ৬৪ কিমি. রাস্তায় ১১টি বাঁক প্রশস্তকরণ কাজ শেষ হয়েছে। এ সড়কে ৪৭টি গতিরোধকের মধ্যে ৩৮টি তুলে দেয়া হয়েছে। এছাড়া তরা সেতুর টোল আদায় কেন্দ্র বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া পাটুরিয়া ঘাটে যানবাহন সারিবদ্ধ রাখতে ৩ কিমি. দীর্ঘ অস্থায়ী ডিভাইডার নির্মাণ করা হবে।
বেহাল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক
মির্জাপুর সংবাদদাতা মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কালিয়াকৈরের চন্দ্রা মোড় এবং কালিয়াকৈর উপজেলার রেলক্রসিংয়ের ওভারব্রিজ থেকে মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কি পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিটুমিন উঠে গিয়ে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে যানবাহন আটকে সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট। এই মহাসড়কে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট হওয়ায় যাত্রীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া এ মহাসড়কের ৩০-৩৫টি স্থান আঁকা-বাঁকা থাকায় ঘটছে দুর্ঘটনা।
মেরামতের এক মাসেই খানাখন্দ সড়ক
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জি এম মনিরুল ইসলাম মিনি জানান, জেলাশহরসহ কালিগঞ্জ-শ্যামনগর সড়কে দুর্ঘটনা এখন নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ঈদে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। মাত্র এক মাস আগে এই সড়কের ঝঁুিকপূর্ণ স্থান মেরামত করা হলেও মাস যেতে না যেতেই আবারও সে সব স্থান খানাখন্দে ভরে গেছে।
মেরামত চলছে
যশোরের কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের সামনে, ঝিনাইদহের বারবাজার, যশোরের নাভারণ মোড়, খুলনার মনিরামপুর চুকনগর, খুলনা থানা এলাকার সুভাষিনী বাজার, যশোরের অভয়নগর থানার নোয়াপাড়া পৌরসভার অন্তর্গত নুরবাগ বাসস্ট্যান্ড, রাজবাড়ীর গোয়ালনন্দ বাসস্ট্যান্ড, বাগমারা-জৌকুড়ি সংযোগ সড়ক, বরিশালের গৌরনদী থানা এলাকার টার্কি বাসস্ট্যান্ড, গৌরনদী বাসস্ট্যান্ড, বাটাজোর বাসস্ট্যান্ড ও ভাঙ্গার মালিগ্রাম বাজার এলাকায় ছোট ছোট গর্ত ছিল। সেগুলো এখন মেরামতের কাজ চলছে। বগুড়া অঞ্চলের সিরাজগঞ্জ-বগুড়া, বগুড়া-রংপুর, রংপুর-দিনাজপুর, লালমনিরহাট-বুড়িমারি, নাটোর-বগুড়া সড়কের নলকা ব্রিজ এবং হাটিকুমরুল গোল চত্বর, মায়ামনি মোড় হতে ধাপের হাট পর্যন্ত, পালদীঘি হতে রাগরপাড়া, ভূমিবন্দর বাজারের পশ্চিম প্রান্ত, মিলনবাজার হতে বড়খাতা বাজার ও খেজুরতলা হতে কালিকাপুর পর্যন্ত ছোট ছোট গর্ত রয়েছে, সেগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে।
নরসিংদীতে যানজট নিরসনে পদক্ষেপ
নরসিংদী প্রতিনিধি নিবারণ রায় জানান, ঈদ সামনে রেখে মহাসড়কে যানজট নিরসনের লক্ষ্যে মাধবদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠা মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা মহাসড়কে না চালানো এবং মহাসড়কের আশেপাশে ও রাস্তার উপরে গড়ে উঠা দোকানপাট সরিয়ে নেয়ার জন্য ৩ দিন সময় দেয়া হয়েছে। এছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যানজটপ্রবণ এলাকা মাধবদী, পাঁচদোনা ও ভেলানগর বাসস্ট্যান্ডে হাইওয়ে পুলিশকে যানজট নিরসনে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।