ময়মনসিংহে যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে নিহতদের স্বজনদের কান্না থামছে না। নিহতদের পরিবারে এখনো চলছে শোকের মাতম।
ময়মনসিংহ উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুপ্ত শুধুই খুঁজছে মা সখিনা খাতুন (৩২), নানী শামীমা খাতুন (৫৫) ও ছোট বোন লামিয়াকে (৫)। নিহত ২৭ জনের মধ্যে ছিল এই তিন জনও। তাদের সঙ্গে সুপ্তও যাকাতের কাপড় সংগ্রহে গিয়েছিল।
ময়মনসিংহ শহরের থানা ঘাটস্থ বেড়িবাঁধ এলাকায় সুপ্তর বাড়ি। সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে জানায়, তারা ৪ জন গিয়েছিল যাকাতের কাপড় আনতে। গেইট খুলে দিতেই বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা হাজার হাজার লোক হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দেয়। সে বলে, ‘ আমি ভিড়ের মধ্যে মাটিতে পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যথা পাই। আমার নিচে চাপা পড়ে আমার নানী। এ সময় নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরির মালিকের লোকেরা লাঠিপেটা শুরু করলে আমি ভিড় ঠেলে বেরিয়ে রাস্তায় এসে আমার মা-বোন ও নানীকে খুঁজতে থাকি। কিন্তু তাদের কোন খোঁজ পাইনি। কিছুক্ষণ পর হঠাত্ দেখি একটা লোক আমার বোনের লাশ নিয়ে যাইতাছে। আমি পরে বাবাকে এসব ঘটনা জানাই।’
এখনো বিলাপ করছে শহরের পাটগুদাম বিহারী ক্যাম্পের সাবা বেগম (৩০)। মা শামীমা ওরফে শামু (৬০), বোন সখিনা (৪০) ও ভাগ্নী লামিয়াকে (৫) হারিয়ে তার আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। বুকফাটা কান্না ও আর্তনাদ করতে করতে বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। আহাজারি করতে করতে বলছিলেন, ‘শুক্রবার পাশের বাসার একজন এসে বলে তোমার মা, বোন ও ভাগ্নি আর নাই। কিন্তু আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। হাসপাতালের মর্গে এসে তাদের লাশ দেখে বুঝছি, একটা কাপড়ের জন্য সবাইকে ছেড়ে তারা চলে গেল। প্রিয়জন হারানোর কথা মনে হলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন তিনি। ময়মনসিংহ বিহারি ক্যাম্পের সিরাজুলের পুত্র সিদ্দিক (১২) মা আর খালার সঙ্গে গিয়েছিল যাকাতের কাপড় আনতে। কিন্তু যাকাতের কাপড় না জুটলেও তার ভাগ্যে জুটেছে কাফনের কাপড়। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ-কী যে ভারী বোঝা, তা আঁচ করা যায় নির্বাক বাবা সিরাজুলকে দেখেই। যাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে নিহত ২৭ জনের বাড়ি পাটগুদাম বিহারী ক্যাম্প, শহরের ধোপাখোলা, আকুয়া, চরপাড়া, কাচারিঘাট, শহরের থানাঘাট, তারাকান্দা, ত্রিশাল ও জামালপুরে। লাশগুলো বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পৌঁছলে কান্নার রোল পড়ে যায় তাদের স্বজনদের মধ্যে।
আট আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
ময়মনসিংহে জাকাতের কাপড় নিয়ে পদদলিত ২৭ শিশু ও নারী হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত যাকাতদাতা মোহাম্মদ শামিমসহ আট আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
এদিকে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিতে হতাহতের বাড়িতে যান এবং তাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের মধ্যে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করেন। এ সময় জেলা প্রশাসক মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকীসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এসময় মন্ত্রী বলেন, এটি কোন ইচ্ছাকৃত ঘটনা নয়। আগামীতে যাতে জাকাত নিয়ে আর কোন অঘটন না ঘটে, এজন্য তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান।
গতকাল রবিবার হতাহতের ঘটনায় মামলার আট আসামিকে পুলিশ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আহসান হাবিবের ১ নং আমলী আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করলে আদালত আসামিদের তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। এর আগে ময়মনসিংহের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তায় আট আসামিকে পুলিশ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর আদালতে হাজির করেন। এরা হলেন নূরানী জর্দ্দা ফ্যাক্টরির মালিক মোহাম্মদ শামিম, তার পুত্র হেদায়েত, ম্যানেজার ইকবাল, আরমান, আলমগীর, কর্মচারী আসাদুল, আব্দুল হামিদ ও গাড়ি চালক পারভেজ। তাদের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অন্যদিকে মালিকসহ আসামিদের মুক্তির দাবিতে কারখানার শ্রমিকরা গতকাল আদালত পাড়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে। শ্রমিকদের দাবি, ঈদের আগে কারখানার মালিক মুক্তি না পেলে শ্রমিকরা বেতন-বোনাস থেকে বঞ্চিত হবে।
