সিলেটে শিশু রাজন হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল সিলেটের বৃহত্তর কুমারগাঁওয়ের ত্রিমোহনায় গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন গ্রাম থেকে বের করা মিছিল সমাবেশ থেকে বিদেশে পালিয়ে যেতে কামরুলকে সহায়তাকারী হিসেবে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের অপসারণ ও শাস্তির দাবি করা হয়েছে। ‘রাজন হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই’—লেখা ব্যানার নিয়ে গতকাল বিকালে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে বিভিন্ন স্থান থেকে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। এতে সভাপতিত্ব করেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আশফাক আহমদ। প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার যাতে ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয় তার চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, জঘন্যতম এই ঘটনার আসামিরা রেহাই পাবেন না। তিনি আসামিদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা ও মামলা নিতে গড়িমসির ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের ১২ ঘন্টার মধ্যে ক্লোজ করার জন্য দাবি জানান।
এর আগে শিশু রাজনের স্বজনদের পক্ষ থেকে তার মামা অভিযোগ করে বলেন, এসআই আব্দুল মালিকসহ অরো এক পুলিশ কর্মকর্তা গোপন বৈঠক করে আসামিদের পালিয়ে যেতে সহয়তা করেছেন। তিনি এইসব পুলিশ কর্মকর্তাদেরও রাজন হত্যার ঘটনায় আসামি করার দাবি জানান। এ সময় সমাবেশ থেকে সবাই হাত উঁচিয়ে ‘সব অপরাধীর ফাঁসি চাই’ বলে স্লোগান দেন।
এদিকে গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন করে দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি বিধানের দাবি জানায়। গোপন বৈঠক ও অর্থের বিনিময়ে কামরুলকে পালাতে পুলিশের সহযোগিতার অভিযোগ:
অর্থের বিনিময়ে জালালাবাদ থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তা আসামী কামরুল ইসলামকে সৌদি আরবে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনের বাবা শেখ আজিজুর রহমান জানান, গত বুধবার রাতে কামরুলের পরিবার বিষয়টি আপসে নিষ্পত্তি করতে তাকে লোক মারফত পাঁচ লাখ টাকার প্রস্তাব দেয় হয়। কিন্তু তিনি এ প্রস্তাবে সায় দেননি। এরপর ওই দিন রাত ১০ টার দিকে তিনি থানায় গিয়ে দেখেন থানার ওসি (তদন্ত) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন ও এস আই আমিনুল ইসলাম আসামি পক্ষের সাথে বৈঠক করছেন। এ সময় আসামি পক্ষের সঙ্গে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার ৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী কামরুলকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা ও আটক মুহিতকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ বৈঠক চলাকালে ওসির কক্ষে ঢুকতে চাইলে রাজনের বাবা ও তার স্বজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এস আই আমিনুল। এক পর্যায়ে তাদেরকে থানা থেকে বের করে দেয়া হয়। এরপর লোকজন থানা ঘেরাও করলে তারা মুহিতকে আটকে রাখতে বাধ্য হয়। তবে কামরুল সৌদি আরবে অনেকটা নিরাপদেই পাড়ি জমায়।
কান্দিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও আজিজুর রহমানের মামাতো ভাই আব্দুল মালিক বলেন, ‘বুধবার রাতে লাশ শনাক্ত করার পর আমরা ওসি তদন্তের রুমে গেলে এস আই আমিনুল আমাদেরকে ১০ মিনিটের জন্য রুমের বাইরে বের করে দেন। আমরা তখন ভয়ে কিছু না বলে থানা থেকে চলে আসি।’ আব্দুল মালিক বলেন, ‘এ সময় এই দুই পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে গোপন বৈঠক হয়। বৈঠকে কি সিদ্ধান্ত হয়—আমরা জানতে চাই।’
এ ব্যাপারে ওসি আখতার হোসেন জানান, তিনি ঘটনার দিন চট্টগ্রামে একটি মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়েছিলেন। কাজেই এ বৈঠক সম্পর্কে তিনি অবহিত নন।
সিলেট মহানগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) রহমতউল্যাহ বলেন, থানায় বাদী পক্ষের সাথে দুর্ব্যবহার ও একজন আসামি পুলিশের সহযোগিতায় পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগসহ সার্বিক বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি জানান, বিষয়টি তদন্ত করতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এম রোকন উদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন—ডিসি (ট্রাফিক) মোশফেকুর রহমান ও এডিসি সদর (দক্ষিণ) জেদান আল মুসা। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এজাহারে এসআই আমিনুল যা বলেছিলেন
জালালাবাদ থানায় দায়ের করা মামলার প্রথম এজাহারে এসআই আমিনুল উল্লেখ করেন, ‘৮ জুলাই ভোর ৬টা ১০ মিনিটে ভ্যান গাড়ী চুরি করাকালে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে মারপিট করলে ওই ব্যক্তি গুরুতর আহত হয় ও পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করে। লাশ উদ্ধারের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই এসআই আমিনুল স্বপ্রণোদিত হয়ে এই এজাহার দায়ের করেন বলে একটি সূত্র অভিযোগ করেছে।
এলাকার একটি সূত্র জানায়, পুলিশ কর্তৃক থানায় মামলা দায়েরের পর রাতে নিহতের লাশ শনাক্ত করেন স্বজনরা। এরপর ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন লাশ দাফন করা হয়। দাফনের আগেই নিহতের স্বজনরা জানতে পারেন এ ঘটনায় পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করেছে।
বুধবার রাত ১১টায় রাজনের পিতা আজিজুর রহমান, চাচা শেষ শফিকুর রহমান ও আল-আমিন, মইয়ারচর গ্রামের মুরব্বী মোহাম্মদ আলী দুদু মিয়া ও মামাতো ভাই আব্দুল মালিক জালালাবাদ থানায় মামলা করতে যান। এ সময় তারা পুলিশকে মামলা নেয়ার অনুরোধ জানান ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের নামও দেন পুলিশের কাছে। তখন ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন ও এস আই আমিনুল ইসলাম নিহতের স্বজনদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে উল্টো রাজনের বাবাকে ‘চোরের বাপ’ বলে ধমক দিয়ে থানা থেকে বের করে দেন। পুত্র শোকে কাতর পিতাকে থানা থেকে বের করে দিয়েই থানার একটি কক্ষে ‘গোপন বৈঠক’ করেন ওসি আলমগীর ও এসআই আমিনুল।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ করেন, রাজনের খুনীদের রক্ষার জন্যেই পুলিশ তড়িঘড়ি করে মামলা দায়ের করে। রাজনের বাবার এজাহার প্রথমে ফিরিয়ে দেয়া হলেও পরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলে ৯ জুলাই থানায় এএসআই জবা এজাহারটি ‘গৃহীত’ বলে গ্রহণ করেন। রাজনের পিতার এজাহারটি অতিরিক্ত এজাহার হিসাবে গ্রহণ করেছে পুলিশ।
দুই প্রত্যক্ষদর্শীর স্বীকারোক্তি
রাজন হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসাবে আটক দুই প্রত্যক্ষদর্শী কুমারগাঁও মোল্লাবাড়ি গ্রামের আজমত উল্যা (৫৫) ও এলাকার একটি ভবনের কেয়ারটেকার ফিরোজ আলী (৬৫) গতকাল মঙ্গলবার আদালতে ১৬৪ ধারায় প্রত্যক্ষদর্শীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেদুল করিম বেলা আড়াইটা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত তাদের জবানবন্দী রেকর্ড করেন। পরে আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মুহিত ছিল ডাকাত, কামরুল সন্ত্রাসী
সিলেটে শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত প্রধান অভিযুক্ত মুহিত আলম এক সময় ডাকাতি ও ছিনতাই-এর মতো অপরাধে যুক্ত ছিল। কুমারগাঁও এলাকার কুখ্যাত ডাকাত নাজিমের (বর্তমানে মৃত) সহযোগী ছিল সে। এ ছাড়া অবৈধ মাদক চোরাচালানের সঙ্গেও যুক্ত ছিল মুহিত। আর সৌদি আরবে ধরা পড়া মুহিতের ভাই কামরুল এলাকায় সন্ত্রাসী-মাসলম্যান হিসেবে পরিচিত। নিরীহ এলাকাবাসী তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করার সাহস পেতো না। মুহিতদের প্রায় পুরো পরিবার নিয়েই এলাকায় রয়েছে কুখ্যাতি। গতকাল সরেজমিন কুমারগাঁও গেলে এলাকাবাসী তাদের ব্যাপারে এমনই অভিযোগ করেন।
রাজনের বাবা হাসপাতালে
রাজনের বাবা আজিজুর রহমানকে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ওসমানী হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা: রেজাউল ইসলাম মোনায়েম জানান, বুকে ব্যথা অনুভব করায় তাকে সিসিইউতে ভর্তি করা হয়। এরই মধ্যে তার তিনটি ইসিজি করা হয়েছে। রাজনের বাবার শ্বাসকষ্টে রয়েছে বলেও জানান ওই চিকিত্সক।
প্রসঙ্গত গত বুধবার সকাল সাতটার দিকে শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যার পর তার লাশ গুমের চেষ্টা করে খুনিরা। ওইদিন সকাল ১১টার দিকে কুমারগাঁও গ্রামে মাইক্রোবাস দিয়ে লাশ গুমের চেষ্টার সময় কেউ একজন উঁকি দিয়ে মাইক্রোবাস থেকে রাজনের লাশ দেখে ফেলেন। পরে আসামি মুহিত আলমকে জনতা হাতে নাতে আটক করে পুলিশে খবর দেন। বুধবার রাতে থানায় গিয়ে পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন রাজনের লাশ।
কামরুলকে ঈদের আগে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা ক্ষীণ
সিলেটে কিশোর রাজন হত্যা
g ইত্তেফাক রিপোর্ট
সিলেটে কিশোর শেখ মো. সামিউল আলম রাজনকে অমানবিকভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সৌদিতে আটক কামরুল ইসলামকে ঈদের আগে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা ক্ষীণ। জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশন সূত্র জানায়, সোমবার থেকে সৌদি আরবে ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে। যে কারণে ঈদের আগে কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা খুবই কম।
গত বুধবার ভ্যান চুরির অভিযোগে ১৩ বছরের কিশোর রাজনকে বেঁধে প্রকাশ্যে দিবোলোকে পিটিয়ে হত্যা করে চার থেকে পাঁচজন। এ ঘটনার পর অভিযুক্ত কামরুল দ্রুতই সৌদি আরবে পালিয়ে যান। সোমবার সৌদি আরবে বাংলাদেশি প্রবাসীরা কামরুলকে জেদ্দা থেকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। বর্তমানে সে নাজলাখ শহর পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তাকে ধরার পর বাংলাদেশ কনস্যুলেট কামরুলের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে। বাংলাদেশে তাকে এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য শিগগিরই দেশে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ কনস্যুলেট তত্পরতা অব্যাহত রেখেছে।
যদিও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো বন্দি বিনিময় চুক্তি নেই। তারপর বাংলাদেশ আশা করছে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার সুবাদে এক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ সহায়তা করবে।
এদিকে, আটকের পর কামরুল ইসলাম রাজন হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। খবরে বলা হয়, জেদ্দা থেকে পাওয়া মোবাইল ফোনের ফুটেজে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকজন তাকে ধরার পর রাজনকে পেটানোর কথা স্বীকার করেছে কামরুল। তবে তার দাবি সে যখন ওই স্থান ত্যাগ করে তখন রাজন জীবিত ছিল। বেসরকারি চ্যানেল এনটিভির এক প্রতিবেদককে তিনি বলেন, রাজনকে একটি প্লাস্টিক স্টিক (প্লাস্টিকের লাঠি) দিয়ে মেরেছিলেন। তবে তিনি রাজনকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এই অপরাধের জন্য ফাঁসি হতে পারে এমন কথা বলা হলে কামরুল কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বলেন তিনি ভুল করেছেন।
ময়না তদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছে, আঘাতের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে কিশোর রাজন মারা যায়। তার শরীরে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার হাত বেঁধে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভিডিও দেখে সৌদি আরবে বাংলাদেশ কমিনিটি কামরুলকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে।