ঢাকা নগর জাদুঘর। অবস্থান রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কার্যালয় ‘নগর ভবনে’। ঢাকার ইতিহাসকে সংরক্ষণের জন্য এই ভবনের ষষ্ঠতলায় রয়েছে জাদুঘরটি। এতে ঢাকার ঐতিহাসিক মূল্যবান উপকরণ রয়েছে। তবে তা রক্ষণাবেক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা নেই। কোনো প্রচার-প্রচারণা না থাকায় দর্শনার্থীও খুব একটা আসে না। ঐতিহাসিক আলোকচিত্রে ধুলাবালির আস্তরণ জমেছে। ফ্রেমের এখানে-সেখানে ঘুণও ধরেছে। পাখা থাকলেও ঘোরে না। এই নগরীর গোড়াপত্তন থেকে বর্তমান অবধি বিখ্যাতদের আলোকচিত্র থাকলেও নেই সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত।
ঢাকা শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্মৃতি সংরক্ষণ ও নগরবিষয়ক গবেষণার জন্য ১৯৮৭ সালে রাজধানীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ঢাকা নগর জাদুঘর’। এটি ঢাকা নগরী সম্পর্কিত জাদুঘর। এখানে সংরক্ষিত আছে ঢাকা নগরীর স্মৃতি সংক্রান্ত জানা-অজানা নানা বিষয়। ঢাকার ইতিহাস সম্বলিত ১০১টি দুর্লভ আলোকচিত্র রয়েছে এই নগর জাদুঘরে। এছাড়াও এই জাদুঘরে ঢাকার প্রথম ছাপাখানা ও নবাবি আমলের হুক্কা, উনিশ শতকে ঢাকার নবাবদের ব্যবহূত পানের বাটা, সে আমলের মুদ্রা, পানদানি, তামার বালতি, জগ, ড্রেসিং টেবিল, শাঁখা ও শাঁখা তৈরির করাত, বদনাসহ নানা উপকরণ। দুর্লভ আলোকচিত্রের মধ্যে আছে- পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেন, রূপলাল হাউস, হোসেনি দালানের আদি রূপ, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, সাতগম্বুজ মসজিদ, উনিশ শতকে নির্মিত বিভিন্ন বাড়ি, সেন্ট জেমস গির্জা (বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে), পুরনো হাইকোর্ট ভবন, ১৯০৪ সালে দিলকুশার নবাববাড়ি, ডানা দীঘি প্রভৃতি।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম ইংরেজি সংবাদপত্র সাপ্তাহিক ‘ঢাকা নিউজ’ মুদ্রণ কাজে ব্যবহূত মুদ্রণ যন্ত্রটি রয়েছে এই জাদুঘরে। এই মুদ্রণ যন্ত্রটি উনিশ শতকের (১৮৪৭-৪৮) মাঝামাঝি সময়ের। সেই সময় এই মুদ্রণ যন্ত্রটি স্থাপন করেছিলেন সুইজারল্যান্ডের স্যামুয়েল বোস্ট। পুরান ঢাকার একটি জীর্ণ বাড়ি থেকে ১৯৮৯ সালে ঢাকা নগর জাদুঘরের ট্রাস্টি হাশেম শফি এই মুদ্রণ যন্ত্রটি এখানে সংরক্ষণ করেছিলেন।
১৯৮৭ সালে ঢাকার ১৩৩, গ্রিন রোডের ‘জাহানারা গার্ডেন’ ছিল বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নগর জাদুঘরের প্রথম অস্থায়ী কার্যালয়। তবে পুরান ঢাকার পাঁচ ভাই ঘাট লেনের একটি বাড়িতে প্রথম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল জাদুঘরটি। ১৯৯৬ সালের ২০ জুলাই নগর ভবনের ষষ্ঠতলার একটি সুপরিসর হলঘরে এটা স্থান লাভ করে। বর্তমানে এটা সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং একটি ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত। নানা ঐতিহাসিক স্থাপনার ওপর কার্ড, পোস্টার, পুস্তিকা এবং ঢাকার বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কয়েকটি গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেছে জাদুঘরটি। উল্লেখযোগ্য হলো- শামসুর রাহমানের ‘স্মৃতির শহর’, আবদুল কাইউমের ‘চকবাজারের কেতাবপঞ্জি’, আবদুল করিমের ‘ঢাকাই মসলিন’, মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকার হারিয়ে যাওয়া কামান’, প্যাকি গ্যাডেসের ‘ঢাকা নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা’। রয়েছে মোগল এবং ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন দলিল, ছবি এবং গ্রন্থসহ নানা জিনিস। ঢাকার ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালসহ নানা আন্দোলনের বেশকিছু দুর্লভ আলোকচিত্র ও পোস্টার রয়েছে।
সকাল ৯টার দিকে জাদুঘর সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং খোলা থাকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। সারাদিনে তেমন কোনো দর্শনার্থী আসেন না এখানে। জাদুঘরটির প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২ টাকা। সপ্তাহের শুক্রবার ও শনিবার বন্ধ থাকে। কর্মচারী ও নিরাপত্তারক্ষীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। একজন কর্মকর্তা জানান, ঢাকার বেশির ভাগ নাগরিক জানেন না- এখানে একটি জাদুঘর আছে। তিনি বলেন, জাদুঘরে ছবিগুলো ক্রমেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।