ফ্রান্সে আইনগত বাধ্যবাধকতা চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া জরুরি: আনোয়ার হোসেন মঞ্জু

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৫, ০০:৪৪

ফ্রান্সে অনুষ্ঠিতব্য আগামী বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২১) একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া জরুরি বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। ফ্রান্স সরকারের কূটনৈতিক উপদেষ্টা এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু রাষ্ট্রদূত ফিলিপ জেলার গতকাল রবিবার সচিবালয়ে তার সাথে সাক্ষাত্ করতে গেলে মন্ত্রী এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

 
এদিকে গতকাল বিকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত সোফি অ্যাবার্টের বাসভবনে কপ-২১ নিয়ে এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেছেন, ফ্রান্স সম্মেলনে বিশ্বের তাপমাত্রা কমিয়ে আনার বিষয়ে আইনগত বাধ্যবাধকতা চুক্তি স্বাক্ষর না হলে দুর্যোগ নেমে আসবে। কপ-২১-এর উদ্যোক্তা ফ্রান্সের জলবায়ু কূটনীতিক ফিলিপ ফ্রান্সিসসহ বাংলাদেশের সুশীল সমাজ এমন মন্তব্য করেছে। বক্তারা বলেছেন, অতীতের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে স্বল্পোন্নত দেশগুলো যে আশা নিয়ে গিয়েছিল তার বাস্তবায়ন হয়নি। এবারের সম্মেলনে এমন কিছু ঘটলে জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা মোকাবিলা নিয়ে উন্নত দেশগুলোর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
 
গতকাল পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সাথে ফিলিপ জেলারের সাক্ষাত্কালে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত সোফি অ্যাবার্ট উপস্থিত ছিলেন। ফিলিপ জেলার এ সময় ২০১৫ সালের শেষ দিকে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রীকে অবহিত করেন। বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে সীমিত রাখার বিষয়ে ফ্রান্স সম্মেলনে একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে তিনি বাংলাদেশের পূর্ণ সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
 
এছাড়া প্রতিটি রাষ্ট্র নিজ নিজ দেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা সীমিত রাখার বিষয়ে তাদের যুক্তিসঙ্গত প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন। ফ্রান্স সম্মেলনে অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে বলে মত ব্যক্ত করেন।
 
বাংলাদেশের জনগণ যা ভাবে
 
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের ধারণা নিয়ে গতকাল রবিবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত সোফি অ্যাবার্টের বাসভবনে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। জলবায়ু বিশ্লেষক ড. কাজী খলীকুজ্জমানের সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠানে ফ্রান্স সরকারের কূটনৈতিক উপদেষ্টা এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু রাষ্ট্রদূত ফিলিপ জেলারসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ফিলিপ জেলার বলেন, ফ্রান্স সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্বের তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামিয়ে আনার ব্যাপারে এ সম্মেলনে কোনো বাধ্যবাধকতা চুক্তি স্বাক্ষর করা না গেলে বিশ্বের জন্য তা বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ভূমিকা ব্যাপকতা পাবে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাংলাদেশ মোকাবিলা করছে ঠিক, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি সম্ভব নাও হতে পারে। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়ত কয়েক বছর মোকাবেলা করা যায়। কিন্তু আজীবন এটা সম্ভব নাও হতে পারে। তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় দীর্ঘ ও স্বল্প মেয়াদী পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন চ্যালেঞ্জিং বিষয়। প্যারিস সম্মেলনে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো এই সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করবে। ফিলিপ জেলার আরো বলেন, প্যারিস জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে একটি বৈশ্বিক জোট গঠন করার চেষ্টা করা হবে। সামনের বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এই জোট কাজ করবে।
 
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরি মাইদুন কপ-২১ এর সফলতা কামনা করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তিনটি বিষয় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এগুলো হলো- মানুষ, প্রকৃতি এবং অর্থনীতি। বাংলাদেশ প্রতিবছর হয়ত ছয় শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এক্ষেত্রে তৈরি পোশাক, প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ এবং কৃষির বড় অবদান রয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অব্যাহত হুমকির মুখে বাংলাদেশ এই প্রবৃদ্ধি ধরে নাও রাখতে পারে। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২০ সালের মধ্যে প্রযুক্তি উন্নয়নে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। বাংলাদেশ এ তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা পেতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলাদেশকে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা শক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে বিদেশি অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন সহজ পথ নেই। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্প্রতি যে ব্লু-ইকনোমির ধারণা ব্যক্ত করেছেন তার প্রশংসা করেন।
 
বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত মিরিট লুনডেমো বলেন, অতীতের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনগুলোর ব্যর্থতা আমরা দেখেছি। প্যারিস সম্মেলনে যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এ লক্ষ্যে উন্নত এবং স্বল্পোন্নত দেশ সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।
 
বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত সোফি অ্যাবাট বলেন, ফ্রান্স জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের সফলতার দিকে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে। একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে এ সম্মেলনের সফলতা জরুরি।
 
বিসিএএসএর নির্বাহী পরিচালক আতিক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীতে যে পরিবর্তন ঘটছে তা জানার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয় না। সাধারণ মানুষই এটা বুঝতে পারে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার চ্যালেঞ্জ বড় হলেও এটি অসম্ভব কিছু নয়। আমাদের হাতে সময় কম। প্যারিস সম্মেলনে একটি আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পন্ন চুক্তি করা না গেলে এর ফলাফল সবাইকে ভোগ করতে হবে।
 
অনুষ্ঠানে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিসিএএসএর স্ট্যাডি সুপারভাইজার গোলাম রব্বানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। এছাড়া বক্তব্য রাখেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব নূরুল কাদির, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক সঞ্চিতা হক, বেসরকারি সংগঠন ফ্রেন্ডশীপ এর পরিচালক রুনা খান প্রমুখ।