সমাবর্তনের অপূর্ণতা

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৯, ১৮:৫৮

  তরিকুল শাওন

 

আব্বু অসুস্থ সেই যখন আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম তখন থেকে। অপারেশনের জন্য অনেক আত্মীয়-স্বজন এক ফোঁটা রক্ত পর্যন্ত দিতে অস্বীকার করেছিল। বাবার অনুপস্থিতিতে আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় কতদূর পড়াশোনা করতে পারতাম আগের লাইনেই সেটা স্পষ্ট। বিধাতা সাথে ছিলেন... বাবা এখনো বেঁচে। ডাক্তারের কাঁচির নিচে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাওয়া বুকটা নিয়ে এখনো আগলে রেখেছেন। জীবনে কোনোদিন কোদাল ধরতে দেননি। আর আট-দশটা নোবিপ্রবিয়ানের চেয়ে বেশ আরামদায়ক আমার জীবন। ভাবছেন গল্প করছি? নাহ গল্প করছি না এটাই বাস্তব।

আমার এখনো মনে পড়ে যখন এসএসসিতে ‘গোল্ডেন এ+’ পেয়েছিলাম। বাবা সারাটা বাজার দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন, একে বলেছে, ওকে বলেছে আমার ছেলে ‘গোল্ডেন এ+’ পেয়েছে। সারাবাড়ি এমনকি আশপাশের বাড়িতেও মিষ্টি বিতরণ হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে বাইপাস অপারেশনের জন্য পা থেকে কেটে নেয়া রগের শেলাইয়ের জায়গা দিয়ে ব্লিডিং হয়ে পায়ের সাথে মোজা আটকে গিয়েছিল। মোজা খুলতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল বুঝতে ছিলাম অথচ এতটুকো কষ্ট তার চেহারায় ফুটে উঠেনি। যাক সে কথা...

ভর্তি হলাম ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। সেখানকার বন্দিজীবন আর নিয়ম-কানুনের সাথে খাপ খাইয়ে উঠতে পারিনি ফলে ফলাফলে ছন্দ পতন। যদিও এটা নিয়ে বাবা তেমন কোনো চিন্তিত ছিলেন না; কারণ বাড়ির অধিকাংশ অগ্রজ ইন্টারে ডাব্বা মেড়েছে। সিদ্ধান্ত ‘ল’ পড়ব। বাবাই বলেছিলেন আমার চাপায় নাকি জোর আছে আর লজিক পেলে যে কাউকে বস করার সামর্থ্য আছে। কিন্তু সেটাও হলো না। যেখানেই পরীক্ষা দেই শুধু ওয়েটিং। চবিতে নৃবিজ্ঞান, জগন্নাথে দর্শন আর রাবিতে ফোকলোর মাইগ্রেশন করে সর্বোচ্চ নৃবিজ্ঞান হতো আর নোয়াখালীতে অর্থনীতি। ‘সাস্টের শিক্ষক’ সম্পর্কে আমার চাচাতো বোনের হাসবেন্ড উনার পরামর্শে সিদ্ধান্ত হয় নোবিপ্রবিতেই পড়ব। আগেই বলেছি বাবা অসুস্থ তাই কোথাও আমাকে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। একাই এসেছি, একাই ভর্তি কার্যক্রম সব শেষ করে প্রায় পাঁচটি বছর পর আজ আমি গ্রাজুয়েট। সময়ের আবর্তনে বদলে গেছে পরিবেশ, বদলে গেছে নোবিপ্রবি। এক সময় যারা নোয়াখালী নাম শুনে মুখ কোঁচকাত আজ তাদের ছেলে/মেয়েকে এখানে ভর্তি করতে না পেরে বিষণ্নতায় মুখ কোঁচকায়।

বাবা কখনো আসেনি আমার ক্যাম্পাসে। আজ বাবা সুস্থ থাকলে খুব ভোরে এসে একদিন কড়া নাড়ত। তোমার সমাবর্তন আমি আসব না! এই গাউনটা যে আমারই দেয়া। আমি না পড়িয়ে দিলে কি তা পূর্ণতা পায়? বাবা-মা সুস্থ থাকলে উনাদের সাথে আজ আমারও ছবি হতো। আমি সকলের নিকট অনেক রাগী আর বদমেজাজি হিসেবে পরিচিত কিন্তু এ লাইনগুলো লিখতে গিয়ে কেন যেন অনেক কাঁদছি। আচ্ছা বাবারা এমন হয় কেন?? সারাটা জীবনই শুধু করে গেল সেক্রিফাইস! তাদের একান্ত নিজের বলে কি কিছুই নেই? নীরবে নিভৃতে বালিশ ভিজছে, দেখছে না কেউ। দেখেনি বাবা মাও, দেখতে দেইনি কোনোদিন। দেখবে কেমনে?? রাগী এ চেহারার নিচে সব ভালোবাসা লুকিয়ে রাখার অভ্যাসটা যে অনেক পুরনো। আসলে কোনো সন্তানই বাবা মায়ের প্রতি ভালোবাসাটা দেখাতে পারে না।  ইতোমধ্যে সমাবর্তনের ছবি পাঠিয়েছি হয়তো তিনিও কাঁদছেন, কাঁদছেন পৃথিবীর এক শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা নাম যার ‘বাবা’। এ কান্না বিজয়ের, গৌরবের, কষ্ট স্বার্থকের। বাবাদের প্রতি অসীম ভালোবাসা রইল। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল বাবা।