মাঠের বাইরে নিপাট ভদ্রলোক আর মাঠে সব কিছু উড়িয়ে দেয়ার আগ্রাসন, ক্যারিয়ারের ৮০ তম টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকা পেসার ডেল স্টেইন ছুঁয়েছেন চারশো উইকেটের মাইলফলক। ম্যাচের হিসেবে তার এই অর্জন দ্বিতীয় দ্রুততম, পেসারদের মধ্যে যৌথভাবে প্রথম। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় এক যুগ পার করে ফেললেও এখানেই শেষ বলতে চান না স্টেইন।
ঢাকা টেস্টের প্রথম দিনে তামিম ইকবালকে নিজের চারশতম শিকারে পরিণত করা স্টেইন প্রথম প্রোটিয়া ক্রিকেটার হিসেবে ছুঁতে চান পাঁচশো উইকেটের মাইলফলক। নিজের উত্তরসূরির লক্ষ্য সম্পর্কে এমনটাই জানিয়েছেন আরেক প্রোটিয়া পেসার এবং স্টেইনের সাবেক কোচ অ্যালান ডোনাল্ড।
গতি আর ফাস্ট বোলারের সহজাত আগ্রাসনের দারুণ এক যুগলবন্দীতে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ছিলেন দর্শকদের আগ্রহের তালিকায়। এরপর সময় যত গড়িয়েছে ততই সমৃদ্ধ করেছেন নিজেকে। কেবল গতির দিকে না তাকিয়ে অস্ত্রভাণ্ডারে যোগ করেছেন নতুন সব অস্ত্র। ফলে দেশের প্রথাগত বাউন্সি উইকেট তো বটেই, সাফল্য পেয়েছেন উপমহাদেশের স্পিনিং উইকেটেও।
তার সময়ের অন্য প্রায় সবার মতো ছোট দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটের দিকে নজর না দিয়ে নিজেকে উজাড় করে দিতে চেয়েছেন টেস্টে। দক্ষতা আর মানসিকতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা বলে মানা হয় যে ফরম্যাটকে, সেখানেই পেয়েছেন ক্যারিয়ারের সেরা সাফল্যগুলো।
পোর্ট এলিজাবেথে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে শুরুর পর সময় যত গড়িয়েছে, নিজেকে ততই উপরের দিকে নিয়ে গেছেন স্টেইন। শন পোলক-মাখায়া এনটিনিদের ছায়া থেকে বেরিয়ে একদিন নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন প্রোটিয়া বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব।
সাফল্য বিচারে কেবল পোলক বাদে নিজের দেশের অন্য সবাইকে পেছনে ফেলেছেন। এই মুহূর্তে যারা খেলছেন তাদের মধ্যে কেবল ইংল্যান্ডের জেমস অ্যান্ডারসনই আছেন স্টেইনের উপরে। তার আগের যে ১২ জন চারশো উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন, তাদের যে কারো চেয়ে কম ম্যাচ খেলেছেন স্টেইন। গ্লেন ম্যাকগ্রা, রিচার্ড হ্যাডলি এবং কার্টলি অ্যামব্রোসের পর স্টেইনই উইকেট প্রতি সবচেয়ে কম রান ব্যয় করেছেন।
নিউজিল্যান্ড কিংবদন্তি হ্যাডলির সমান ৮০ ম্যাচে স্টেইন পা রাখলেন ‘চারশোর ক্লাবে’। পেসারদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ছুঁয়েছেন এই দু’জন। সব মিলে হিসেব করলে তাদের চেয়ে এগিয়ে আছেন কেবল শ্রীলঙ্কার স্পিন জাদুকর মুত্তিয়া মুরালিধরন। ইতিহাসের একমাত্র বোলার হিসেবে ৮০০ উইকেট নিয়ে মুরালিধরন আছেন সবাইকে ছাড়িয়ে।
চলমান ঢাকা টেস্টের আগে স্টেইনের খেলা ৭৯ টেস্টের ৬১ টিতেই জয় অথবা ড্র করেছে তার দল। দক্ষিণ আফ্রিকা দলে স্টেইনের প্রভাব বোঝাতে বোধহয় এই একটি তথ্যই যথেষ্ট।
একসময় প্রোটিয়াদের পেস আক্রমণে নেতৃত্ব দেয়া ডোনাল্ডের বিশ্বাস, নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে স্টেইনের প্রাণান্ত চেষ্টাই তাকে আলাদা করে তুলেছে অন্য সবার চেয়ে। ‘সাদা বিদ্যুৎ’ ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘তাকে আলাদা করে তুলেছে যে গুনটা সেটা তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মানসিকতা। সবসময়ই তার মধ্যে একটা ক্ষুধা কাজ করে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে ঠিক করে, দিন শেষে তাকে এমন একজন হতে হবে যে কিনা দিনের সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা গড়ে দিয়েছে। প্রায় সব সময় এই লক্ষ্য পূরণ করেই ঘুমাতে যায় সে।’
অবসরে যাবার আগে স্টেইন আরো অন্তত একশো উইকেট নিতে চান, এমন লক্ষ্যের কথাও জানিয়েছেন ডোনাল্ড, ‘আশা করছি সে ৫০০ উইকেটে পৌছাতে পারবে। কারণ সেখানেই সে নিজেকে দেখতে চায়। আমাকে সে এমনটাই জানিয়েছে। আর সেটা করতে পারলে অবিশ্বাস্য একটা অর্জন হবে।’
বিশ্বকাপে বিপুল প্রত্যাশা থাকলেও তার সামান্যই মেটাতে পেরেছেন স্টেইন। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্টে মাঠে নামার আগেও ছিলেন বিশ্রামে। তবে ডোনাল্ডের বিশ্বাস, এখনও প্রচুর গুলি অবশিষ্ট স্টেইনের। আপাত বাজে ফর্মের ধারা ভেঙ্গে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে শক্তিশালীভাবে ফিরে আসবেন তিনি, ‘ডেল লড়াই করেই ফিরবে। শীর্ষ ক্রীড়া তারকারা সব সময়ই ফিরে আসার কোন না কোন উপায় খুঁজে বের করে এবং সেও তাই করবে। তার এখনো দেয়ার মতো অনেক কিছু আছে। দু’পায়ের উপর এখনো সে যথেষ্ট হালকা। আরো অনেক রাস্তা ছোটার ক্ষমতা আছে তার।’ ওয়েবসাইট অবলম্বনে
