প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনের নামে গত ৬ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিন বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে যারা দেশজুড়ে নাশকতা চালিয়েছে তাদের কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। অগ্নিসন্ত্রাসীদের কেউই রেহাই পাবে না। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যাতে কেউ এ ধরনের বর্বরতা চালানোর সাহস না পায় সেজন্য ওদের বিরুদ্ধে আইনানুগ দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা আমরা নিতে শুরু করেছি। চলতি বছরের শুরুতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় পেট্রোল বোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে হতাহত এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাস মালিকদের আর্থিক সহায়তার চেক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১৮৫ জন বাস মালিক, নিহত ১৫ জনের পরিবারের ৩০ জন সদস্য ও সাতজন আহতকে মোট আট কোটি ৩৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকার ২২২টি চেক হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী।
হরতাল ও অবরোধে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে। মানুষ স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ করে নিজেদের জীবনযাত্রা উন্নত করবে এটাই ছিলো সবার কামনা। আর সেখানে যদি এভাবে মানুষের ক্ষতি করা হয় তাহলে আমরা তা বরদাশত করবো না। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেয়ার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমি জানি, যে ক্ষতি আপনাদের হয়েছে, সেটা পূরণ করা সম্ভব না। তারপরও আমাদের একটা চেষ্টা রয়েছে, জনগণের পাশে দাঁড়ানোর। সব সময় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার অঙ্গিকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াতের নাশকতার ঘটনায় দেশের সাময়িক ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু তারা দেশকে ধ্বংস করতে পারেনি। ধ্বংসাত্মক ঘটনা মোকাবিলায় দলমত নির্বেশেষে সবার সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারো ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে জীবন্ত মানুষ পোড়ানোসহ মানুষের এত বড় ক্ষতি কেউ কখনো করতে পারে, তা কল্পনাও করা যায় না। নিজের রাজনীতির লক্ষ্য তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনীতি করি জনগণের স্বার্থে, জনগণের কল্যাণে, জনগণের মঙ্গলের জন্য। জনগণকে পুড়িয়ে মারা কিংবা দেশ ও জনগণের ক্ষতি করা কোনো রাজনীতি হতে পারে না। এটা সম্পূর্ণ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড। আর বিএনপি-জামায়াত জোট সেটাই করেছে। বিএনপি ও জামায়াতের ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবিলা ও প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনগণের সাহসিকতার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের সাহসী ভূমিকা দেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ আর এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। একটি পরিবারের একজনের মৃত্যুতে ওই পরিবারের অনেক ক্ষতি হয়। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেছে এবং আমি মানুষকে সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে চাই।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙা, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ প্রমুখ। প্রসঙ্গত, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ডাকে এই বছরের জানুয়ারি থেকে তিন মাস ধরে চলা হরতাল-অবরোধে বাস-ট্রাকে পেট্রোল বোমা হামলায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে নারী, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ প্রায় দেড়শ’ মানুষের মৃত্যু হয়। নাশকতায় নিহতের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্ত মোট ৯৯৪ জনকে এ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে চার দফায় ৩৩ কোটি টাকারও বেশি অনুদান দেয়া হল।
কুয়েত ও চেক রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাত্ :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কুয়েতের রাষ্ট্রদূত আলী আহমেদ ইব্রাহিম আল-দাফিরি ও চেক প্রজাতন্ত্রের অনাবাসিক রাষ্ট্রদূত মিলোস্ল্যাভ স্টেসেক। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৃথকভাবে তারা এ সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন। দুই রাষ্ট্রদূতই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেন। সাক্ষাত্ শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।
বাংলাদেশের উন্নয়নে কুয়েতের সহযোগিতার জন্য রাষ্ট্রদূতকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশে আরো বিনিয়োগ করতে কুয়েতের বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে কুয়েতের আমিরকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। কুয়েত ফান্ড ফর এরাবিক ইকোনমিক ডেভলপমেন্টের (কেএফএইডি) মাধ্যমে কুয়েত অর্থায়ন বাড়াবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
এসময় কুয়েতের রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ ও কুয়েতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুরু হচ্ছে এবং বর্তমানে সেনাবাহিনীর প্রায় ৫ হাজার সদস্য কুয়েতে পুনর্গঠন কাজ করছে। পরে রাষ্ট্রদূত চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ সংস্কারের জন্য ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চেক হস্তান্তর করেন।
অন্যদিকে চেক রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাত্কালে ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, বিদ্যুত্সহ বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট ভাষা শিক্ষক বিনিময়ের বিষয়ও তাদের আলোচনায় প্রাধান্য পায়।