দুর্ঘটনা এড়াতে গতকাল শনিবার থেকে মহাসড়কে অটোরিকশা, টেম্পুসহ অযান্ত্রিক সব যান নিষিদ্ধ করেছে সরকার। গত ২৭ জুলাই থেকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ নিষেধাজ্ঞার এ প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু হাইওয়ে ও জেলা পুলিশ অভিযান শুরু করলেও নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিন মহাসড়কে এর প্রভাব খুব একটা দেখা যায়নি। অপরদিকে দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি,কখনো দমকা বাতাস নিয়ে চলা বৃষ্টির মধ্যে দেশের অধিকাংশ মহাসড়কে এসব যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। এসব যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়ার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে অটোরিকশা মালিক ও শ্রমিকরা।
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিখ ফকরুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশা, টেম্পুসহ অযান্ত্রিক যানবাহন আটক অভিযান শুরু হয়েছে। তবে গতকাল সকাল থেকে দেশের কয়েকটি স্থানে মহাসড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এসব যানবাহনের মালিক ও শ্রমিকরা। তবে কোথায় বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়নি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গতকাল থেকে নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। সারাদিনই ছিল বৃষ্টি। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিকে কিছু কিছু এলাকায় এসব যানবাহন চলাচল করেছে। তবে তার সংখ্যা অনেক কমেছে।
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাইয়ের ৩৩ কিলোমিটার, ১৬ ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার সকল আঞ্চলিক সড়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য সিএনজি চলাচল বন্ধ রয়েছে। প্রতিবাদে মিরসরাইয়ের প্রায় ১০টি স্পটে বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া পার্শ্ববর্তী ফটিকছড়ি উপজেলার হেঁয়াকো এলাকার প্রায় ৫ শতাধিক সিএনজি চালক বারইয়ারহাটে সমাবেশে অংশ নেয়। এতে সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়।
এই কর্মসূচির আওতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই সদর, মিঠাছড়া, ঠাকুরদিঘী, চৈতন্যারহাট, সোনাপাহাড়, বড়তাকিয়া, হাদিফকিরহাট, নিজামপুর কলেজ, বড়দারোগাহাট ও বারইয়ারহাট পৌর বাজারে পৃথক মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
সহকারী পুলিশ সুপার (সীতাকুন্ড সার্কেল) সালাহউদ্দিন শিকদার বলেন, মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধের প্রতিবাদে চালকদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন শেষে তারা ফিরে গেছে।
মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, গতকাল শনিবার দুপুরে ময়মনসিংহ- উত্তরবঙ্গ সড়কের মুক্তাগাছা শহরের সাহেব বাজার এলাকায় এলোপাতাড়ি অটোরিকশা রেখে ঘণ্টাব্যাপী অবরোধ পালন করে চালকরা। এ সময় মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় । খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে দাবির প্রেক্ষিতে সমঝোতার আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেয়া হয় ।
রাজশাহী অফিস জানায়, রাজশাহী জেলা প্রশাসন সরকারি আদেশ কার্যকরের প্রথম দিন গতকাল রাজশাহীর সব মহাসড়কে থ্রি হুইলার ও অটোরিকশা বন্ধে ৩৫টি মামলা দায়ের এবং যানবাহন চালকদের অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এসব যানবাহন চলাচল বন্ধে অভিযান চলে। মহানগরের তিনটি পয়েন্টেও চেকপোস্ট বসানো হয়।
সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে রাখা হয়। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত টানা ৪ ঘন্টা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে অটোরিকশা শ্রমিকরা। এসময় মহাসড়কের উভয় পাশের মেঘনা থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সোনারগাঁও থানার ওসি শাহ্ মো: মঞ্জুর কাদের ঘটনাস্থলে গিয়ে পূর্বের ন্যায় সিএনজি, ইজিবাইক, ভটভটি (টমটম), ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চলাচল করতে পারবে এমন ঘোষণা দিলে অবরোধকারীরা তাদের অবরোধ তুলে নেয়।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সকাল ১১টার দিকে মহাসড়কটির মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউসিয়া পয়েন্টে সিএনজি, অটোরিকশা মালিক শ্রমিকরা এ অবরোধ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকায় মহাসড়কে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ যানযট। গজারিয়ার ইউএনও মাহাবুবা বিলকিস জানান, প্রশাসনের পদক্ষেপে অবরোধ তুলে নেয়া হয়।
মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, গতকাল শনিবার দুপুরে অটোরিকশা মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠন সড়ক অবরোধ করে। স্থানীয় আঞ্চলিক সমবায় ইনস্টিটিউটের সামনে দুপুর ১টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে সংগঠনটি।
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, সরকারের নির্দেশে ঝিনাইদহ জেলার হাইওয়েগুলোতে সিএনজি চালিত অটো, নসিমুন, করিমন ও আলমসাধু চলাচল বন্ধে পুলিশের অভিযান শুরু হয়েছে। তবে কোন কোন স্থানে হাইওয়েতে নসিমন ও আলম সাধু চলাচল করতে দেখা গেছে। গতকাল শনিবার জেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে হাইওয়েগুলোতে অটো, টেম্পো, নসিমন, আলমসাধু চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়।
টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান খোন্দকার জানান, গতকাল থেকে টেকনাফ বাস স্টেশন পোয়ারা থেকে হাইওয়ে সড়কে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত তিন চাকার বাহন নসিমন, করিমন, ভটভটি, সিএনজি (অটোরিকশা), টমটম, ব্যাটারি চালিত রিকশা, মাহিনন্দ্রাসহ যানবাহন চলাচল না করার জন্য মালিক ও শ্রমিকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এরপরও যারা নির্দেশ অমান্য করবে তাদেরকে আটক করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর শাহ মো. আরিফুর রহমান জানান, গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ১০২টি অটো আটক করা হয়েছে।
টাঙ্গাইল জেলা অটো শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক মহসিন সিকদার জানিয়েছেন, মহাসড়কে অটো চলাচল বন্ধ করার প্রতিবাদে আজ রবিবার ভোর থেকে ৪৮ ঘন্টার কর্মবিরতি পালন করার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিকরা।
সিলেট অফিস জানায়, মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলে সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে আজ রবিবার থেকে সিলেটে সকল সড়ক-মহাসড়কে অবস্থান ধর্মঘট পালনের ঘোষণা দিয়েছে জেলা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন। গতকাল শনিবার দক্ষিণসুরমার ভার্থখলায় ইউনিয়নের এক জরুরি সভা শেষে নেতৃবৃন্দ এ ঘোষণা দেন।
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, মহাসড়কে সিএনজি, অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কয়েকশ অটো চালক গতকাল শনিবার বিকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নীলকুঠি এলাকায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। তারা বিকাল সাড়ে ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত মহাসড়কে গাছ ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করে রাখে। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে।
ওসমানীনগর (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, মহাসড়কে অটো রিকশা নিষিদ্ধ হওয়ার প্রথম দিনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় অংশে মহাসড়কসহ সংযোগ রাস্তাগুলোতে সিএনজি চালিত অটো রিকশা শূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে যাত্রী সাধারণের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বেশ কিছু সিএনজি গতকাল শনিবার সকালে মহাসড়কে অবস্থান নিলেও পুলিশি বাঁধায় চলাচল করতে পারেনি।
প্রাপ্ত্য তথ্য থেকে জানা যায়, সারাদেশের জাতীয় মহাসড়কের পরিমাণ ৩ হাজার ৫৮০ কিলোমিটার। আর মহাসড়কের মধ্যে দেশের পাঁচটি জেলায় রয়েছে সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা। এগুলো হচ্ছে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকা। একের পর এক দুর্ঘটনার কারেণ গত বছর হাইকোর্ট দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ১০ জেলার মহাসড়কে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত তিন চাকার বাহন নছিমন, করিমন, ভটভটি না চালানোর নির্দেশ দেয়। পরে সরকারও মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধে কঠোর হয়। কিন্তু গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশা দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে গেলে বিষয়টি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঈদের ছুটির মধ্যে গত ২০ জুলাই রাতে সিরাজগঞ্জে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড় সংযোগ মহাসড়কে বাসচাপায় অটোরিকশার পাঁচ আরোহীর মৃত্যু হয়। এর আগে গত ১৭ জুলাই মুন্সীগঞ্জে বাস-অটো সংঘর্ষে দুইজন নিহত হন। আগের দিন কিশোরগঞ্জে ট্রাক্টরের চাপায় প্রাণ হারান অটোরিকশার তিন যাত্রী। একই দিনে আখাউড়ায় মাইক্রোবাসের ধাক্কায় অটো খালে পড়ে মারা যান তিনজন। গত ১৫ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঢাকা সিলেট মহাসড়কে পিকআপ ভ্যান ও অটোরিকশার সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন।