সারাদেশে নদী ভাঙনের কবলে আরো বহু গ্রাম

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৫, ০১:৪৭

গত সপ্তাহে হঠাত্ শুরু হওয়া ভারী বর্ষণ, ঘুর্ণিঝড় কোমেন ও সাগরের জোয়ারের প্রভাবে অনেক এলাকা প্লাবিত হয়ের্িছল। গতকালও নদী  ও বেড়িবাধ ভাঙনে নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে গেছে। সারাদেশে অনেক জেলার হাজার হাজার গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। কোথাও কোথাও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা দিয়েছে। ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

 
শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বরে নতুন করে পদ্মার ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে আধাঘন্টায় অনেক বাড়ির জায়গা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ঘর ও স্থাপনা ভেঙ্গে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে পদ্মা পারের বাসিন্দারা। ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভাঙ্গন আতংকে ঘর ও স্থাপনা নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আধাঘন্টার মধ্যে ৩০টি বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ভাঙনের হুমকিতে আছে সুরেশ্বর বাজার, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা।
 
খুলনা অফিস জানায়, অবিরাম বৃষ্টিতে উজানের পানির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের দুর্বল বেড়িবাঁধগুলো ভাঙতে শুরু করেছে। বর্তমানে আরো শতাধিক বেড়িবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মানুষ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টানা বর্ষণ ও উজানের পানির চাপের কারণে বেড়িবাঁধগুলো ভাঙছে। একদিনের ব্যবধানে দাকোপ উপজেলা ও ডুমুরিয়া উপজেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে পানি। পাউবো খুলনা-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী পিযুষ কৃষ্ণ কুন্ডু বলেন, বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলো মেরামতের জন্য ইতিমধ্যে টেন্ডার হয়ে গেছে। অর্থ ছাড় হলেই কাজ শুরু হবে।
 
সেনবাগ (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, প্রবল বর্ষন ও ফেনী নদী থেকে ধেয়ে আসা জোয়ারের পানির কারণে নোয়াখালীর সেনবাগে গত এক সপ্তাহ ধরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ভয়াবহ বন্যায় রুপ নিয়েছে। স্মরণকালের ভয়াবহ এ বন্যায় সেনবাগ পৌরসভাসহ উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মনবেতর জীবন যাপন করেছে। অনেক রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। ফলে এলাকার মানুষজন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
 
নড়িয়া (শরীয়তপুর) সংবাদদাতা জানান, শরীয়তপুর নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বরে গতকাল সোমবার সকালে ৪৫টি বাড়ীঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে । স্থানীয়লোকজন কোন  কিছু বোঝার আগেই স্রোত বৃদ্ধি পেয়ে বাড়িঘর  তলিয়ে যায়। লোকজনকে খোলা আকাশের নীচে মানবতার জীবনজাপন করতে হচ্ছে।
 
মণিরামপুর (যশোর) সংবাদদাতা জানান, অতিবর্ষনে কপোতাক্ষ নদের উপচে পড়া পানিতে মণিরামপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। কৃষি জমি, বাড়িঘর, মত্স্য ঘের, রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা পুরোটাই ভেঙ্গে পড়েছে। উপজেলার ১২ টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে জ্বর, ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে বন্যা কবলিত এলাকায়। খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে কোন কোন এলাকায়।
 
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, টানা  বর্ষণে জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট বন্যার পানিতে ডুবে বেগমগঞ্জ উপজেলার দূর্গাপুর গ্রামের শারজাহান বেগম (৫০) নামের এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার সকাল ১০ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। দেড় মাস আগে তার স্বামী গোলাম মোস্তফার মৃত্যু হয়েছিল।
 
বরগুনা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি জানান, বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে অন্তত ৫টি গ্রামের ঘর-বাড়ি প্লাবিত হয়েছে। ভাঙ্গা বাঁধ দিয়ে লবন পানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে কৃষি জমি ও বীজতলা। এছাড়া গতকাল জোয়ারের পানিতে বরগুনা শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক, পশু হাসপাতাল সড়ক, কলেজ রোড, সিরাজউদ্দীন সড়কের পাশের ঘর-বাড়ি এবং চরকলোনীসহ কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
 
কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের পাউবোর ১৪/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধ ভেঙে শাকবাড়িয়া গ্রামের ১৪টি পরিবার সহ বেশ কয়েকটি চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়েছে। কপোতাক্ষ নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং প্রবল ভাঙনে হঠাত্ একটি চর সহ শাকবাড়িয়া গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়।
 
তালা (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, অবিরাম বর্ষণ ও কপোতাক্ষ নদের উপচে পড়া পানিতে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিতে নিমজ্জিত থাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষাসহ সকল পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান। খুলনা-পাইকগাছা সড়কের উপর একাধিক স্থান দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। পাখিমারা বিলে টিআরএম এলাকায় কপোতাক্ষ নদের সঙ্গে সংযুক্ত খালের পানিতে ডুবে বালিয়া গ্রামের ইউসুফ আলী (৫৪) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এলাকায় মাছের ঘের ও ফসল ক্ষেত ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধেও ধস দেখা দিয়েছে।
 
পাইকগাছা (খুলনা) সংবাদদাতা জানান, পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের  রহিমপুর ও নোয়াকাটি মালোপাড়ায় কপোতাক্ষের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙ্গে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে কাঁচা বাড়িঘর ধসে পড়েছে। ভেঙ্গে পড়েছে পয়ঃনিস্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের নোয়াকাটি গ্রাম সংলগ্ন কপোতাক্ষ নদের ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে  গিয়ে প্লাবিত হয়েছে নোয়াকাটি, হরিদাসকাটি, হরিঢালী, উলুডাঙ্গা, রহিমপুর সহ কয়েকটি গ্রাম। ্ক্ষয়ক্ষতির পরিমান তত্ক্ষনিক জানা না গেলেও স্থানীয়রা জানান কাঁচা বাড়ি ঘর ধসে মুল্যবান জিনিসপত্র নষ্ট হয়েগেছে।
 
বেনাপোল (যশোর) সংবাদদাতা জানান, অতি বর্ষন  ভারতের ইছামতি নদীর পানির চাপ ও বাওড়ে অবৈধ পাটা দিয়ে মাছ চাষ করার কারনে সীমান্তবর্তী শার্শা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ১৫ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে এসব গ্রামে বসবাসকারীরা। ক্ষেতের ফসল,মাছের ঘের হারিয়ে এখন পোষা গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে বিপদে পড়েছে তারা।
 
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট)সংবাদদাতা জানান, অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে গত ৪ দিনে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার পৌর সদরসহ ১০ ইউনিয়নের ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ফসলের মাঠে পানি ঢুকে আমন বীজতলা ও মত্স্য ঘেরের  ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষক ও ঘের ব্যবসায়ীরা। পানি বন্ধি হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার। পানগুছি নদীর কুল ছাপিয়ে জোয়ারের পানি প্রবাহিত হওয়ায় স্কুল, কলেজ ,ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রশাসনিক চত্বরে পানি ঢুকে পড়েছে।
 

এছাড়া মেহেরপুর, উখিয়া (কক্সবাজার), বাউফল, দাগনভূঞা (ফেনী), ফকিরহাট (বাগেরহাট), চকরিয়া (কক্সবাজার), নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা) ও রাজশাহী অফিস থেকে প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির খবর জানিয়েছেন।