ঘৃণায় ক্ষোভে উত্তাল খুলনা

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০১৫, ০০:০০

পৈশাচিকভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু রাকিবের ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে খুলনার মানুষ। হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় নগরীর প্রাণকেন্দ্র পিকচার প্যালেস মোড় থেকে শহীদ হাদিস পার্ক পর্যন্ত দীর্ঘ মানববন্ধন হয়েছে। মানববন্ধন কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবাধিকার ও শিশু সংগঠনসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষের শ্লোগানে কেঁপে ওঠে গোটা নগরী। সকলের এক দাবি-শিশু রাকিবের বর্বর হত্যাকারী ‘গ্যারেজ মালিক শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টুর ফাঁসি চাই।

 
শিশু রাকিব হত্যা রহস্য উন্মোচনে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। ইতিমধ্যে মামলাটির তদন্ত মনিটরিং করতে কেএমপির পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে, নিহত রাকিবের বাড়িতে এখনো চলছে শোকের মাতম। বিভিন্ন স্থান থেকে আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ মানুষ এসে রাকিবের মা, বোন ও বাবাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন; কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই সন্তানহারা মা-বাবা ও ভাইহারা বোনের কান্না থামাতে পারছে না।
 
শিশু রাকিবের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে বেসরকারি সংস্থা জন উদ্যোগ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার উদ্যোগে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়ে মানববন্ধন হয়। এ সময় সমাবেশে বক্তারা বলেন, খুলনায় শিশু রাকিব হত্যাকাণ্ড যেন সিলেটের শিশু রাজন হত্যার পুনরাবৃত্তি। এভাবে বার বার শিশুহত্যা রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। পৈশাচিক ও নির্মম এই হত্যাকাণ্ড বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। কোনভাবেই যেন অপরাধীরা আইনের ফাঁক-ফুকুর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে তার জন্য প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা শিশু নির্যাতন বন্ধ ও শিশু অধিকার রক্ষায় দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
 
বক্তারা সরকারের নিকট শিশু রাকিব হত্যা মামলাটি অবিলম্বে চাঞ্চল্যকর মামলা হিসাবে গ্রহণ করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এ সময় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে রাকিবের পিতা নূরুল আলম হাওলাদার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি আর কোন দিন আমার কলিজার টুকরো রাকিবকে ফিরে পাব না; কিন্তু যারা তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে তাদের যেন ফাঁসি হয়’।
 
জন উদ্যোগ, খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদার সভাপতিত্বে এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম ও জন উদ্যোগ খুলনার সদস্য সচিব মহেন্দ্রনাথ সেন মানববন্ধন কর্মসূচি পরিচালনা করেন। বৃক্ততা করেন খুলনা মহানগর বিএনপি সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, আওয়ামী লীগ নেতা শ্যামল সিংহ রায়, সাংবাদিক নেতা আবু হাসান, ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা মফিদুল ইসলাম, আজিজুর রহমান, অশোক কুমার সাহা, অধ্যাপিকা রমা রহমান, শামীমা সুলতানা শীলু, রসু আক্তার, কবি বিষ্ণুপদ সিংহ প্রমুখ।
 
মামলা মনিটরিংয়ে পুলিশের তিন সদস্যের কমিটি
 
হত্যা রহস্য উদঘাটনে গতকাল বুধবার খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তিন সদস্যের মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার মাহবুব হাকিম। অন্য দুই সদস্য কেএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান মিঠু ও সহকারী পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবীর। মনিটরিং কমিটি গতকাল বুধবার বেলা ১২টায় নিহত রাকিবের বাবা নূর আলম হাওলাদার, মা লাকি বেগম ও বোন রিমির সাথে কথা বলেন।
 
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গ্যারেজ মালিক শরীফের মা বিউটি বেগম কিছু তথ্য দিয়েছে। বৃহস্পতিবার  আদালতে তার রিমান্ডের শুনানি হবে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত গ্যারেজ মালিক শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টু সুস্থ হলে তাদেরকে প্রিজন সেল থেকে আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে।
 
শিশু রাকিব হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত গ্যারেজ মালিক শরীফের মা বিউটি বেগমকে আজ বৃহস্পতিবার রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাস করা হবে। খুলনা সদর থানার ওসি সুকুমার বিশ্বাস জানান, বিউটি বেগমকে গ্রেফতার করে গত মঙ্গলবার আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই কাজী মোস্তাক আহমেদ। আজ বৃহস্পতিবার রিমান্ডের শুনানি শেষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। তিনি জানান, বিউটি বেগমকে গ্রেফতার করার পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এ হত্যা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। এ মামলার অপর দুই আসামি শরীফ ও মিন্টু বর্তমানে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিত্সাধীন রয়েছে। চিকিত্সকরা ছাড়লেই তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
 
অসুস্থ হয়ে পড়েছেন মা ও বোন
 
সন্তান হারিয়ে শোকে পাথর রাকিবের মা লাকি বেগম। গত সোমবার রাত থেকে গতকাল বুধবার দুপুর পর্যন্ত তিনি কিছুই খাননি। ওই সময় থেকে এক মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে কেউ ঘুম পাড়াতে পারেনি। তিনি কেবলই কাঁদছেন। মনিটরিং কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। মায়ের পাশে বসে রাকিবের একমাত্র ছোট বোন শিশু রিমি ভাইয়া ভাইয়া বলে কেঁদে উঠছিল। পরে থানার সামনে রাকিবের মা লাকি বেগম এই প্রতিনিধিকে বলেন, ‘রাকিবের খুনি গ্যারেজ মালিক শরীফের ভাই আরিফ তাকে বেশি বাড়াবাড়ি না করার জন্য হুমকি দিয়েছে। সে তাকে হুমকি দিয়ে বলেছে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তার ফল ভালো হবে না।’
 

এদিকে নিহত রাকিবের বাড়িতে এখনও চলছে শোকের মাতম। আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ মানুষ এসে রাকিবের মা, বোন ও বাবাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই যেন সন্তানহারা মা-বাবা ও ভাই হারা বোনের কান্না থামাতে পারছে না।