ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ
আমার জন্ম পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকে। জন্মের পর দেখতাম বাবা-চাচাসহ আশপাশে সবাই পাট চাষ করছে। সে সময় কৃষকের স্বপ্নই ছিল এ পাটকে কেন্দ্র করে। কারণ বিশ্ববাজারে এদেশের পাট ও পাটজাত দ্রব্যের একক আধিপত্য ছিল। রপ্তানি আয়ের শীর্ষ খাতও ছিল পাট। ব্রিটিশ আমল তো বটেই, পাকিস্তান আমলেও এ অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল পাট। এ পাটের যে কতটা কদর ছিল, তা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আবার আমার চোখের সামনে পাটের সে সোনালি দিন মলিন হয়ে যাওয়ার দৃশ্যও দেখতে হয়েছিল। কিন্তু পাট এ ভূখণ্ডের মানুষের মতোই নানা দুর্বিপাক আর বিপর্যয় থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে।
আমার দেখা, ব্রিটিশরা এ দেশ থেকে বিতাড়িত হলে এই অঞ্চলের পাটশিল্প নিয়ন্ত্রণে চলে যায় পাকিস্তানিদের হাতে। সেই ধারাবাহিকতায় পূর্ব পাকিস্তানের ২২ পরিবারের অন্যতম আদমজী পরিবারের তিন ভাই ওয়াহেদ আদমজী ওরফে দাউদ আদমজী, জাকারিয়া আদমজী এবং গুল মোহাম্মদ আদমজী যৌথভাবে ১৯৫০ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ২৯৭ একর জমির ওপর আদমজী জুট মিলের নির্মাণকাজ শুরু করেন। ১৯৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর যার উত্পাদন শুরু হয়। পরবর্তীকালে সারাবিশ্বে আদমজী একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। আদমজীনগর বা নারায়ণগঞ্জকে স্কটল্যান্ডের ড্যান্ডি শহরের নামানুসারে প্রাচ্যের ড্যান্ডি বলা হতো। এর আগে ‘বাওয়া গ্রুপ’-এর উদ্যোগে ১৯৫১ সালের ‘দি বাওয়া জুট মিলস’ স্থাপিত হয়। নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি খুলনার খালিশপুর, দৌলতপুর হয়ে উঠেছিল পাট শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পাটের গুদামে অগ্নিসংযোগ করেছে, কারখানা ধ্বংস করে পাট শিল্পের ব্যাপক ক্ষতি করেছে, কলকারখানার যন্ত্রাংশ পাকিস্তানে পাচার করেছে। এ রকম যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে সীমিত সাধ্যের মধ্যে বঙ্গবন্ধু পাটখাতসহ সবক্ষেত্রে যে উন্নয়ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন, তা ছিল সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এ সময় দেশে ৮৭টি পাটকল চালু ছিল। তার শাসন আমলে, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ৩৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। এর মধ্যে শুধু কাঁচা পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৩১ কোটি ৩১ লাখ ডলার। অর্থাত্ মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ এসেছে পাট থেকে।
পঁচাত্তর পরবর্তী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশপ্রেমহীন শাসককুলের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত এবং পাটের বিকল্প হিসেবে সিনথেটিক পণ্যের ছড়াছড়ির কারণে বাংলাদেশের পাট তার গৌরব হারিয়েছে। পাটশিল্প চলে গেছে ধ্বংসের মুখে। শুধু ধ্বংস নয়, বঙ্গবন্ধুর প্রণীত ১৯৭৩-৭৮ সময়ে যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল তা পরবর্তী সময়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণীত হলেও সেখানে পাটখাতের উন্নয়নে পূর্ববর্তী পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। এমনকি, আশির দশক থেকে অলাভজনক দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হতে থাকে পাটকল। এভাবে ৮৭টির মধ্যে ৬০টি পাটকলই বেসরকারি মালিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময়, পাটের বস্তার পরিবর্তে পরিবেশ দূষণকারী পলিথিনের উত্পাদন ব্যাপক হারে বেড়ে যায় এবং ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পলিথিনের উত্পাদন শুরু হয়।
তবে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে বাংলার পাট আবারো নতুন সম্ভাবনার মুখ দেখছে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারের আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পাট ও পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এই চাহিদা বৃদ্ধি বাংলাদেশের সোনালি আঁশের সোনালি ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে পাট ও পাটপণ্যে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি পাটখাতের উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
পরিশেষে, দেশে পাটের ব্যবহার বাড়াতে হবে। গবেষণা করে পাটের উন্নত জাত তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মোবারক হোসেন পাট থেকে পলিথিনের বিকল্প পলিথিন সদৃশ বস্তু আবিষ্কার করেছেন। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অতি দ্রুত এর উত্পাদন করা জরুরি। এ পলিথিন সহজে পচনশীল এবং পরিবেশ বান্ধব। এর ব্যবহার বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি, যা থেকে প্রচুর অর্থনৈতিক আয় সম্ভব হবে। সারা পৃথিবীর লোকেরা এখন পরিবেশ বান্ধব দ্রব্য ব্যবহার করতে আগ্রহী, আর এর জন্য পাট একটি নেয়ামত। এ সুযোগ ব্যবহার করা জরুরি।
ফলে সুপরিকল্পনামাফিক উত্পাদন অব্যাহত রাখলে পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে এনে দেশকে সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলা শুধু সময়ের ব্যাপার।
n লেখক :উপাচার্য, শেরেবাংলা
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
