আলোকপাত
সুধীর সাহা
নদীর নাম বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ আর বালু। এই চারটি নদ-নদী ঘিরে রেখেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরকে। ঢাকা শহরের পরিবেশ রক্ষায় এই চার নদী যুগান্তকারী অবদান রেখে যাচ্ছিল শত বছর ধরে। কালক্রমে ঢাকার মানুষ যখন অনেকটাই বদলে যাওয়া শুরু করল, তখন এই চার নদীর সীমানাও বদলাতে শুরু করল। নদীর বুকে নৌকা আর পাল তুলে চলতে পারল না। নদীর পার ঘেঁষে বধূরা কলসী কাঁখে জল তোলা দূরে থাক, নদীর কোনো পারেই কেউ একটু খোলা জায়গায় বসে থাকবে তারও কোনো উপায় থাকল না। নদীর কান্না বুকে লাগা দূরে থাক, নদীর ছলছল পানির আওয়াজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মৃত্যুকান্নাও পৌঁছল না মানবতার কর্ণকুহরে। কিভাবে পৌঁছবে! মানুষের মানবতাই যে উড়ে চলে গিয়েছে ইট, বালু, সিমেন্টের চত্বরে। চাপা পড়ে গিয়েছে মানবতাবাদী কোমল হূদয়ের যত ভালো দিকগুলো। দখল-বেদখলের খেলায় মত্ত আজকের সুবিধাবাদী সমাজের মানুষগুলো। স্থলভাগের যেটুকু পেরেছে, তাতো দখল করেছে অনেক আগেই। সরকারি জমি দখলের হলি খেলায় মাতোয়ারা থেকেছে বছরের পর বছর। একসময় হয়ত স্থলভাগের অবশিষ্ট জমিগুলো যথেষ্ট ছিল না, তাইত হাত বাড়ালো নদীর দিকে। প্রথমেই নদীর তীরগুলো দখলে নেবার চেষ্টা। সে কী বাহানা! কত না বহুরূপী বাহানা সাজানো হয় দখলের নামে। পাড়ের একটু একটু করে দখলের পর তারপর আবার নদীর ভিতরের দিকে আগমন। কংক্রিট দিয়ে এমনভাবে পার ঘেঁষে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল যে, একসময় নদীর মধ্যবুকেও বসবাস শুরু হয়ে যায় এইসব সুনামধারী মানুষদের। ঠিক এমনই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ আর বালু। প্রভাবশালী মানুষের বুটের আঘাতে এই নদীগুলোর জীবন্ত পানি ছিটকে পড়েছে মাটির নিচে পাতালপুরীতে। তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে পাকা-আধাপাকা, স্থায়ী-অস্থায়ী, নানা ধরনের স্থাপনা। সিএস রেকর্ড অনুযায়ী নদীর অংশ থাকলেও আজ তা মানুষের তৈরি বিশাল অট্টালিকায় ভরা ব্যস্ততম শহরের অংশবিশেষ। সেখানে কারখানা আছে, ঘর-বাড়ি আছে, রেস্টুরেন্ট আছে, অফিস আছে, বস্তি আছে, দোকান আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কী নেই ওসব স্থানে! এই জায়গাগুলোর মালিক আজ প্রভাবশালী বলে পরিচিত সমাজের কিছু দুষ্টু লোক। নদীর নাব্যতা, নদীর চলমান গতি, নদীর সীমানা কোনোটার কোনো মূল্যই নেই এই দখলকারী মানুষ নামের সামাজিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর।
সরকার ইতোমধ্যে এই চার নদ-নদীর মধ্যে অবস্থিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আশার কথা হচ্ছে, উচ্ছেদ অভিযানকে শক্তিশালী করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এগিয়ে এসেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বয় সভা করেছেন এবং নদ-নদীর তীরবর্তী অঞ্চল মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনারও আহ্বান জানিয়েছেন। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা গণতান্ত্রিক কোনো সরকারের পক্ষেই সহজ কাজ নয়। এ তো আবার নদী দখল! দখলকারীর পুরোটাই লাভের প্রশ্ন। মরিয়া হয়েই তারা বাধা দেবে সরকারকে। তাইত সরকারের কঠিন কোনো চাপও প্রভাবশালীদের বড় চাপের মধ্যে পড়ে অথৈ পানিতে তলিয়ে যায়। সরকার প্রধানের সদিচ্ছা, জনস্বার্থে প্রদত্ত আদালতের নির্দেশনা সবকিছুই যেন একসময় হাওয়ায় উড়ে যায়। না, এবার বুঝি তেমনটা হচ্ছে না। অন্তত এটুকু চিন্তা করার কিংবা বিশ্বাস করার সুযোগ ঘটেছে এবার।
বিশ শতকের শুরুতে এদেশে ভূমি জরিপের কাজ শুরু হয়েছিল এবং সার্থকভাবে সেই জরিপ কার্যকর হয়েছিল ১৯৪২ সালে। এই জরিপটিই সিএস রেকর্ড হিসেবে পরিচিত। সিএস রেকর্ড আজও বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, আদর্শ এবং নির্ভেজাল জরিপের রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃত। ঢাকার চারপাশে চারটি নদ-নদীকে সিএস রেকর্ড হিসেবে বিবেচনা করে এর প্রকৃত সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করতে পারলেই ঢাকার চারদিকে বিস্তৃত চারটি নদ-নদীর সমস্যার সমাধান হতে পারে। অবৈধ স্থাপনা স্থায়ী না অস্থায়ী এবং অবৈধ দখলকারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয় কী—এসব কিছু যদি পরিহার করা যায়, তবেই নদীকে তার জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার কাজটি বাস্তবায়িত হতে পারে।
n লেখক :সাবেক সেনা কর্মকর্তা
