ভদ্রলোকদের ‘অদ্ভুত’ শট

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৫, ১৭:০৬
 
ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেট। আর এই ভদ্রলোকের খেলার মাঠের ও মাঠের বাইরের ভদ্রলোকেরা দিন দিন এই খেলাটিকে দর্শকদের কাছে আরও উত্তেজনাকর হিসেবে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মাঠের বাইরের ভদ্রলোকেরা, যারা ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতি নির্ধারক হিসেবে পরিচিত তারা খেলাটিতে নিত্য-নতুন পরিবর্তন এনে ক্রিকেটকে আরও আকর্ষণীয় করতে চেষ্টা করছেন। মাঠের ভদ্রলোকের দায়িত্ব অবশ্য ভিন্ন। তারা আবিস্কার করছেন নানারকম ক্রিকেটীয় অস্ত্রের। বিশেষ করে ব্যাটসম্যানদের কথা না বললেই নয়। এক সময় ক্রিকেটে ব্যাটিং মানেই ছিল কিছু নির্দিষ্ট শটে বন্দি ব্যাটিং পরিদর্শন। কিন্তু ওয়ানডে ক্রিকেটের আগমনের পর অনেকেই বের হয়ে এসেছেন এই গণ্ডি থেকে। যার ফলও দেখেছে ক্রিকেট দুনিয়া। ব্যাটসম্যানদের ব্যাট থেকে বের হয়েছে অভাবনীয় সব শট। কেউ কেউ তো এসব শটের আবিস্কারক হিসেবেই স্বীকৃত। বাকিদের ভূমিকা পারদর্শীতায়। ক্রিকেট মাঠের এমন কিছু বিশেষ শট, তাদের আবিস্কারক এবং পারদর্শী কয়েকজন ব্যাটসম্যান নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।

 

সৌম্যের পেরিস্কোপ:
 
মোহাম্মদ আশরাফুলের প্যাডল স্কুপ বা সাকিব আল হাসানের সুপার স্কুপ ক্রিকেট ভক্তদের কাছে অজানা নয়। বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন সেনসেশন সৌম্য সরকার যেভাবে খেলছেন তাতে ক্রিকেট ভক্তদের কাছে অজানা থাকার কথা নয় তার উদ্ভাবিত ক্রিকেট শট পেরিস্কোপও। নতুন এই শটের জনক সৌম্য এরইমধ্যে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছেন তার এই পেরিস্কোপ দিয়ে।

 

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ঘটনা। বাংলাদেশ ইনিংসের পঞ্চম ওভারের খেলা চলছে। কাইল অ্যাবটের একটি বল, লেগস্ট্যাম্পের ওপরের বল লেগ সাইডে সরে, শরীরটা ধনুকের মতো বাঁকিয়ে সৌম্য বল তুলে দিলেন গালিতে থাকা ডেভিড উইজার মাথার ওপর দিয়ে। কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ শট হলেও উইজা বল স্পর্শও করতে পারেননি। আর তাই থার্ডম্যান সীমানা দিয়ে বল মাঠের বাইরে, আর বাংলাদেশের প্রাপ্তি চারটি মূল্যবান রান।

 

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সৌম্য’র পদচারণা খুব বেশিদিনের নয়। গত ডিসেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে ক্রিকেটের কঠিন জগতে তার আগমন। তবে অল্প সময়েই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন তিনি। প্রতিপক্ষের বোলারদের ঘুম তো কেড়ে নিয়েছেনই। চোখ-ধাঁধানো ড্রাইভ-কাট-পুলের সঙ্গে সৌম্যর তূণে যোগ হলো আরেকটি তীর ‘দ্য পেরিস্কোপ’। বাংলাদেশের জন্য এটা দারুণ খবর, আর প্রতিপক্ষের জন্য দুঃসংবাদ!

 

শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে নিখুঁত নিশানায় পাঠানো দুর্দান্ত শটটি নিয়ে আইসিসিও অভিভূত। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা শটটিকে তুলনা করেছে ধোনির হেলিকপ্টার শটের সঙ্গে। নিজেদের অফিশিয়াল পেজে আইসিসি লিখেছে, ‘এমএস ধোনি হেলিকপ্টার শটের জন্য বিখ্যাত। সৌম্য সরকার কি ‘দ্য পেরিস্কোপ’-এর জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠবে?’

 

হেলিকপ্টারে অনন্য ধোনি:
 
সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত শট সম্ভবত এমএস ধোনির হেলিকপ্টার শট। আর এই শটে ভারতীয় অধিনায়ক এতোটাই পারদর্শী যে ইয়োর্কার বলেও সীমানা পার করছেন অনায়াসে। এই শটে ধোনিকে খুব সাবলীল মনে হলেও শটটি খেলা কিন্তু মোটেও খুব একটা সহজ নয়।

 

হেলিকপ্টারের পাখার মতো ব্যাট চালিয়ে এই শটে ব্যাটসম্যানকে যেকোনো সময়েই পড়তে হতে পারে বড় ধরনের ইনজুরিতে। কারণ ব্যাটে-বলে সংঘর্ষের পরেও শটের কিছু অংশ বাকি থেকে যায়। তাছাড়া এই শটে হাতের কব্জির ব্যবহারও রয়েছে।

 

ধোনির ভাষ্য অনুযায়ী, ছেলেবেলা থেকেই এই শটের অনুশীলন করে আসছেন তিনি। টেনিস বলে টেপ পেঁচিয়ে এই শটের অনুশীলন করতেন তিনি। আর এজন্যই হেলিকপ্টার শটে এতোটাই পারদর্শী তিনি। তবে ভারত অধিনায়ক নিজেও মানেন যে, এই শট খেলা ব্যাটসম্যানদের জন্য মোটেও সহজ নয়। কারণ এতে কব্জির ব্যবহার তো রয়েছেই তাছাড়া ব্যাটও চালাতে হয় বেশ দ্রুততার সাথে।

 

দিলশানের দিলস্কুপ:
 
ক্রিকেটীয় পরিভাষায় শ্রীলঙ্কান ওপেনার তিলকারত্নে দিলশানের অনন্য সংযোজন হলো দিলস্কুপ। গুড লেন্থ বা সামান্য শর্ট লেন্থের ফাস্ট বা মিডিয়াম পেস বল এক হাঁটুতে ভর দিয়ে স্কুপ করে উইকেটরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে খেলা শটই দিলস্কুপ নামে পরিচিত। সরাসরি উইকেটরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে খেলার জন্য এই শটে বাউন্ডারি এক রকম নিশ্চিতই দিলশানের। আর বোনাস হিসেবে পাওয়া যায় প্রতিপক্ষের বোলারের আত্মবিশ্বাসে কিছুটা মরচে ধরিয়ে দেওয়া!

 

তবে দিলশানের এই শট কিন্তু নিউজিল্যান্ডে মোটেও দিলস্কুপ নামে পরিচিত নয়! কিউইরা বরং এই শটকে ম্যাকস্কুপ বলতেই বেশি পছন্দ করে থাকেন। আর করবে নাই বা কেন! তাদের প্রিয় ব্যাটসম্যান ম্যাককালামও যে এই শটে কম পারদর্শী নন!

 

সুইচ হিটের জনক কেপি:
 
বর্তমানে ক্রিকেট ভক্তদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ হলো সুইচ হিট। আর আকর্ষণীয় এই শটটির জনক বলা হয় ইংলিশ ব্যাটসম্যান কেভিন পিটারসেনকে। ব্যাটসম্যান বল হিট করার শেষ মুহূর্তে স্ট্যান্স বদলে যে শটটি খেলেন তাকেই বলে সুইচ হিট। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে কোনো বাহাতি ব্যাটসম্যানের শেষ মুহূর্তে ডান হাতি ব্যাটসম্যানের স্ট্যান্স নিয়ে শট খেলা। অসি ব্যাটসম্যান ডেভিড ওয়ার্নারও কিন্তু এই শটে দারুণ পারদর্শী।

 

রিভার্স সুইপের রাজা অ্যান্ডি:
 
প্রতিপক্ষের বোলারদের একরাশ হতাশা উপহার দিতে যেন জুড়ি নেই রিভার্স সুইপের। আর এই কাজটিই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করতেন সাবেক জিম্বাবুইয়ান উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার।

 

সুইপ শটের ঠিক বিপরীত শটটিই অর্থাত্ ক্রস ব্যাটের শট রিভার্স সুইপ নামে পরিচিত। রিভার্স সুইপে ব্যাটসম্যান অফসাইডে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে বা থার্ডম্যানের দিকে বল পাঠিয়ে দেন। আর বল-ব্যাটে ভালো সংযোগ হলে তো কথাই নেই। সহজেই মিলে যায় মূল্যবান চারটি রান। রিভার্স সুইপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে প্রতিপক্ষের ফিল্ডিং সাইডকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে দেওয়া।

 

এই শতাব্দির শুরুর দিকে জিম্বাবুইয়ান ব্যাটসম্যান অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার রিভার্স সুইপে দারুণ পারদর্শিতা দেখালেও এই শটের জনক কিন্তু বলা হয় পাকিস্তানি কিংবদন্তী ব্যাটসম্যান হানিফ মোহাম্মদকে। আর এই শটটি প্রথম নিয়মিত খেলা শুরু করেন মোহাম্মদ মুশতাক।

 

দ্য ম্যারিলিয়ার শট:
 
২০০১-০২ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ায় একটি ত্রিদেশীয় সিরিজের ঘটনা। অস্ট্রেলিয়ার ৩০২ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করছে জিম্বাবুয়ে। সাত নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে নামলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একেবারেই নতুন এক ক্রিকেটার ডগলাস ম্যারিলিয়ার। জয়ের জন্য জিম্বাবুয়ের তখন প্রয়োজন ৭ বলে ১৫ রান। কিন্তু পরের বলে হিথ স্ট্রিকও আউট। শেষ ওভারে জিম্বাবুয়ের প্রয়োজন ১৫ রান। গে­ন ম্যাকগ্রার করা শেষ ওভারে জিম্বাবুয়ে নিতে পারলো ১৩ রান যার ১২ রানই এসেছে ম্যারিলিয়ারের ব্যাট থেকে। ১ রানে ম্যাচ হারলো জিম্বাবুয়ে, কিন্তু ক্রিকেট বিশ্ব দেখলো অদ্ভুত এক শট, যা ক্রিকেট অভিধানে ম্যারিলিয়ার শট নামে জায়গা করে নিয়েছে!

 

ম্যাকগ্রার সেই ওভারের প্রথম ও তৃতীয় বলে অদ্ভুতভাবে কাঁধের ওপর দিয়ে ফাইন লেগ দিয়ে বল সীমানা পার করিয়েছিলেন ম্যারিলিয়ার। এই শট খেলার জন্য ম্যারিলিয়ারকে কোচের বকুনিও খেতে হয়েছিল সে সময়! এই শট যেকোনো ক্রিকেটীয় শট হিসেবে তখনও স্বীকৃতি পায়নি!

 

তবে এই শট খেলতে কোচের অনুমতি আদায় করতে খুব বেশি সময় নেননি ম্যারিলিয়ার। পরের বছরেই ভারতের ফরিদাবাদের মাটিতে ভারতকে ‘ম্যারিলিয়ারড’-এ আচ্ছন্ন করলেন তিনি! এবার সমীকরণ আরও কঠিন। তবে সময়ও পেয়েছেন বেশি।

 

ভারতের ২৭৪ রানের জবাবে জিম্বাবুয়ে তখন নিশ্চিত পরাজয়ের সামনে দাঁড়িয়ে। ম্যারিলিয়ার যখন দশম ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে এলেন জয়ের জন্য জিম্বাবুয়ের চাই ৩৪ বলে ৬৫ রান, হাতে ২ উইকেট। শুরু হলো ম্যারিলিয়ারের লড়াই! মাঝে তাতেন্দা তাইবু আউট হলেও থামেননি ম্যারিলিয়ার। মাত্র ২৪ বলে ১০টি চার ও ১ ছক্কায় অপরাজিত ৫৬ রান করে দলকে ১ উইকেটের জয় এনে দিলেন ম্যারিলিয়ার এবং ম্যারিলিয়ারের এসব রানের একটা বড় অংশই এসেছে উইকেটের পেছন থেকে। ভারতীয় বোলারদের বল কাঁধের ওপর দিয়ে অদ্ভুতভাবে সীমানা ছাড়া করছিলেন তিনি। ম্যাচ শেষে তত্কালীন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি বলেছিলেন, ‘এমন অদ্ভুত ইনিংস জীবনেও দেখিনি!’