বিল সি-২৪ নামের কানাডায় যারা দ্বৈত নাগরিক নতুন আইন অভিবাসীদের মধ্যে রীতিমত ভীতির সঞ্চার হয়েছে। যা এখন সংসদে পাশের অপেক্ষায় করছে। বিলটি গত জুন মাসে রাজ সম্মতি লাভ করে। রানীর পক্ষে বিলটিতে সই করেন কানাডার গভর্ণর জেনারেল ডেভিড জনস্টন।
কানাডায় যারা দ্বৈত নাগরিক তাদের কেউ যদি এখন সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিযুক্ত হন বা কানাডার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন অথবা অন্যকোন গুরুতর অপরাধ করে অভিযুক্ত হন তবে সরকার নতুন এই আইনের মাধ্যমে তার নাগরিকত্ব বাতিল করে তাকে কানাডা থেকে বহিস্কার করতে পারবে।
অথচ কানাডা জাতিসংঘের “কনভেনশন অন দি রিডাকশন অব স্টেটলেসনেস (১৯৬১)” সনদে স্বাক্ষরকারীদের একটি দেশ। ঐ সনদ অনুযায়ী কাউকে রাষ্ট্রহীন করা যাবে না। যা সম্পূর্ণ দ্বৈতনীতি।
টরন্টোর প্রবাসী কন্ঠের সম্পাদক খুরশিদ আলম এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, নতুন এই আইনের কার্যকারিতা শুরু হওয়ার পর নাগরিকত্ব হারানোর আশংকা ছাড়াও আরো যে সকল আশংকা দেখা দিয়েছে দ্বৈত নাগরিকদের মধ্য তা হলো, বাড়ি ক্রয়সহ অন্যান্য কাজে তারা ব্যাংক ঋণের জন্য আবেদন জানালে তা পাওয়া দুরুহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভাবতে পারে এই দ্বৈত নাগরিকেরা কানাডার নাগরিত্ব হারালে তাদের কাছে থেকে পাওনা অর্থ আদায় করা কঠিন কিংবা জটিল হয়ে উঠতে পারে। ফলে অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আইন পরিবর্তন করতে পারে।
বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনেও জটিলতা দেখা দিতে পারে। যারা প্রথম শ্রেণীর নাগরিক তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কস্থাপনে আগ্রহী নাও হতে পারেন। কারণ কোন কারণে দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে এমন স্বামী বা স্ত্রী কানাডার নাগরিকত্ব হারালে দাম্পত্য জীবন হয়ে উঠবে চরম দুর্বিসহ। স্বামী থাকবেন এক দেশে আর স্ত্রী থাকবেন অন্য দেশে। এভাবে চলতে থাকলে সম্পর্ক বিচ্ছেদের সম্ভাবনা শতকরা প্রায় একশতভাগ। বিপদ আরো আছে। বৈবাহিক সূত্রে একজন কানাডিয়ান (যিনি দ্বৈত নাগরিক নন) তার স্বামী বা স্ত্রী যে দেশ থেকে এসেছেন সে দেশের নাগরিক হয়ে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তাকেও কানাডা থেকে বহিস্কার করা হতে পারে যদি তিনি কোন গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হন। ফলে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিককে বিয়ে করার ঝুকি প্রথম শ্রেণীর নাগরিকরা না-ও নিতে পারেন।
দ্বৈত নাগরিকেরা বিভিন্ন ব্যবসায় মোটা অংকের পুঁজি লগ্নি করা থেকে বিরত থাকতে পারেন। তাছাড়া বড় মাপের কোন ব্যবসা শুরু করা থেকেও তারা বিরত থাকতে পারেন এই ভয়ে যে নাগরিকত্ব হারালে সর্বস্ব যাবে। নাগরিকত্ব হারালে লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও জটিলতা দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে শূন্যহাতে নিজ নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে হতে পারে।
ফলে সাম্প্রতিককালে যেসব পরিবর্তন এনেছে তার অধিকাংশই অগণতান্ত্রিক। কানাডার ইমিগ্রেশন এন্ড রিফুজি অইনজীবীগণ এবং এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কানাডাও মনে করে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। তারা সকলেই এই বিল সি-২৪ এর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে দ্বৈত নাগরিকদের নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়টি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
সিভিল রাইটস গ্রুপস এবং এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মনে করে নতুন এই আইন দ্বৈত নাগরিকদের জন্য বৈষম্যমূলক। এর মাধ্যমে দ্বৈত নাগরিকদেরকে এক অর্থে ‘লেস কানাডিয়ান’ কাতারে ফেলা হয়েছে এবং কানাডায় জন্ম নেয়া নাগরিকদের চেয়ে কম অধিকারসম্পন্ন করে তোলা হয়েছে। বৃটিশ কলম্বিয়ার সিভিল লিবার্টিজ এসোসিয়েশন এর ভাষ্য মতে দ্বৈত নাগরিকরা এখন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে গেল।
বৃটিশ কলম্বিয়া সিভিল লিবার্টিস এসোসিয়েশন এর নির্বাহী পরিচালক জোস পিটারসন ইয়াহু কানাডার কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নাগরিত্ব বাতিলের এই আইনটি এক ধরণের পরিহাস। তিনি বলেন, বৃটেনে আজ থেকে ৮শত বছর আগে একটি আইন ছিল যে আইনের বলে দেশ থেকে নাগরিকদেরকে বহিস্কার করা যেত। আজ ৮শত বছর পর সেই আইন আবার আমরা কানাডায় ফিরিয়ে এনেছি। তিনি বলেন, দেশ থেকে কোন নাগরিককে বহিস্কার করার প্রথাটি ছিল মধ্যযুগীয় ব্যাপার।
কানাডার হ্যালিফেক্সে অবস্থিত ডালহৌসী ইউনিভারসিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক জনাথন স্যাপ্রিয় বলেন, নাগরিকত্বের বিষয়টি সবার ক্ষেত্রেই অভিন্ন ধরণা হওয়া উচিৎ। একেক জনের জন্য একেক নিয়ম বা আইন হবে তা বাঞ্ছনীয় নয়।
নাগরিকত্ব লাভের জন্য ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্টকেও কঠিন করা হয়েছে আগের তুলনায়। বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট পাস করা কঠিন। তা জানা সত্বেও কর্তৃপক্ষ বয়সের মাত্রা আরো বৃদ্ধি করেছে। আগে নিয়ম ছিল ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যক্তিদেরকে ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট পাস করতে হবে। এখন নিয়ম হয়েছে ১৪ থেকে ৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যক্তিদেরকে ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট পাস করতে হবে।
বিল সি-২৪ সম্পর্কে টরন্টো ইউনিভারসিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক এন্ড্রু ম্যাকলিনের বক্তব্য এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেন, “নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টিকে অধিকার হিসেবে না দেখে সুবিধা হিসেবে দেখার যে কথা বলছেন ইমিগ্রেশন মন্ত্রি সেটি নাগরিকত্বের ধারণা বা অর্থকে পরিবর্তন করে দিয়েছে নতুন ইমিগ্রেন্টদের কাছে এবং যারা দ্বৈত নাগরিক তাদের কাছে। ব্যাপারটি এখন এমন হয়ে দাড়িয়েছে যে, সরকার ইমিগ্রেন্টদেরকে নাগরিকত্ব দিবে তাদের ‘ভাল ব্যবহার’ দেখে এবং প্রদত্ত সেই নাগরিকত্ব আবার ছিনিয়ে নিবে তাদের ‘খারাপ ব্যবহার’ দেখে।
অধ্যাপক এন্ড্রু ম্যাকলিন আরো বলেন, “নাগরিকত্ব অধিকার নয় একটি সুযোগ এই বক্তব্যের প্রবর্তণ করা হয়েছে ইমিগ্রেন্টদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থেকে। নেতিবাচক এই ধারণাটি হলো-ইমিগ্রেন্টরা প্রতারক।
ইমিগ্রেন্টদের সম্পর্কে এরকম নেতিবাচক ধারণা কানাডায় একেবারে নতুন তা নয়। তবে বর্তমান ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দল এই নেতিবাচক ধরণাকে আরো উস্কে দিলো নতুন এই বিল সি-২৪ পাস করিয়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর পরিণতিতে কানাডায় ইমিগ্রেন্ট বিরোধী মনোভাব আগামীতে আরো শক্তিশালী ও চাঙ্গা হয়ে উঠবে সন্দেহ নেই। এতে ফলাফল যা হবার তাই হবে। অর্থাৎ ইমিগ্রেন্ট আসা কমে যাবে। কারণ জেনেশুনে কেউ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হতে আসবে না এই দেশে।
বিরোধী দল লিবারেল ও এনডিপি’র পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের এই দ্বৈত ইমিগ্রেশন পলিসিকে নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে দাঁড় করাবে।
লিবারেল দলের ইমিগ্রেশন সমালোচক জন ম্যাককুলিন বলেন, “ক্ষমতায় গেলে আমরা রক্ষণশীল দলের প্রবর্তিত বেশ কিছু ইমিগ্রেশন আইন বাতিল করে দিব।
ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) মাল্টিকালচারালইজম সমালোচক এন্ড্রু কেস বলেন, “ ক্ষমতাসীন দল ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় রুঢ়ভাবে যে পরিবর্তন এনেছে তা সংশোধন করবো আমরা যদি ক্ষমতায় যাই।”
চ্যালেঞ্জ আসছে বিল সি-২৪ এর বিরুদ্ধেও। টরন্টো ভিত্তিক সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনজীবী রোকো গালাতি সম্প্রতি সিটিভি নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানান, বিল সি-২৪ এর বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। আগামী শরৎকালের শেষের দিকে অথবা শীতের শুরুতে বিষয়টি নিয়ে তিনি আদালতে হাজির হবেন।
