উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ

পাসের হারে ছন্দপতন

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০১৫, ২৩:১৪

গত বছর এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বিভিন্ন পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছিল ‘সৃজনশীলতার জয় হয়েছে’। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ নানা উদ্যোগের কারণে ফল ভালো হয়েছে। এক বছর পরই সেই একই পরীক্ষার ফলের চিত্র ঠিক উল্টো। যাকে এক কথায় ফল বিপর্যয় বলা চলে। যদিও এর নেপথ্যে বিএনপি-জামায়াতের সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিকে প্রধান কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। এছাড়া প্রশ্ন পদ্ধতি পরিবর্তনও প্রভাব ফেলছে বলে তিনি জানান।

 
দেশের দশটি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলতি বছর অনুষ্ঠিত উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার এ ফল গতকাল রবিবার সারাদেশে একযোগে প্রকাশ করা হয়েছে। এবার ১০টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। গতবারের চেয়ে এবার পাসের হার ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমেছে। পাসের হারে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় হয়েছে যশোর বোর্ডে ৪৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে বোর্ড অনুযায়ী পাসের হার আট শিক্ষা বোর্ডে ৬৫.৮৪ শতাংশ, মাদ্রাসা বোর্ডে ৯০.১৯ শতাংশ ও কারিগরি বোর্ডে ৮৫.৫৮ শতাংশ।
 
১০টি শিক্ষা বোর্ডে গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফল প্রকাশের ১৫তম বছরে গতবারের মতো এবারও সব বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পাসের হার কমার পাশাপাশি গতবছরের চেয়ে এবার জিপিএ-৫ ও কমেছে। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪২ হাজার ৮৯৪ জন। গতবার এ সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার ৬০২ জন।
 
গতকাল দুপুর ১টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ ফলের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এর আগে সকাল ১০টায় গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাসমূহের ফল হস্তান্তর করেন শিক্ষামন্ত্রী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খানসহ দেশের শিক্ষা বোর্ডসমূহের চেয়ারম্যানরা। এ বছর পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৫৯ কর্মদিবসে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হল।
 
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘১ জানুয়ারি থেকে দেশে হরতাল-অবরোধ শুরু হয়। এতে আমরা শিক্ষা পরিবার ছিলাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এর কারণে কলেজে নিয়মিত ক্লাস হওয়া ও পিছিয়ে পড়া বিষয়গুলোতে বাড়তি ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে কলেজগুলোর যে প্রস্তুতি, তা তারা সম্পন্ন করতে পারেনি। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগের ওই সময়টি সেভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। তিনি আরো বলেন, আরেকটি বিষয় হল আমরা সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করেছি। আমাদের হয়তো অনেক ত্রুটি ও প্রস্তুতির অভাব রয়েছে। এখন এটাকে আমাদের আরো উচ্চতর স্তরে নিয়ে যেতে হচ্ছে।
 
উচ্ছ্বাস শিক্ষার্থীদের, কোথাও হতাশা : গতকাল দুপুরে কলেজগুলোর পাশাপাশি ওয়েবসাইটেও ফল প্রকাশ করা হয়। এছাড়া মোবাইল ফোনে এসএমএস-এর মাধ্যমেও শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার ফল জানতে পারে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কলেজগুলোতে নেমে আসে আনন্দের বন্যা। সকাল থেকেই মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতিটি কলেজ প্রাঙ্গণ। ফল প্রকাশের পর অভিভাবক, শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দের বৃত্ত তৈরি করেন শিক্ষার্থীরা। বাদ্য বাজিয়ে, হৈ-হুল্লোড় করে হাতে হাত রেখে নেচে-গেয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা। পরীক্ষার ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই মিষ্টির দোকানগুলোতে মিষ্টি কেনার ধুম পড়ে যায়। তবে পাসের হার কমে যাওয়া ও প্রত্যাশিত সংখ্যক জিপিএ ৫ না পাওয়ায় গতবছরের মতো উচ্ছ্বাস করেনি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে যশোর বোর্ডের কলেজগুলোতেই ছিল এই হতাশার চিত্র। অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে এই বোর্ডের কলেজগুলো থেকে।
 
গতকাল একই সঙ্গে ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসির পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি (ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা), ডিপ্লোমা ইন কমার্স এবং এইচএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষার ফলও প্রকাশিত হয়েছে।
 
এগিয়ে রাজশাহী, পিছিয়ে যশোর : আট সাধারণ বোর্ডের অধীনে এবার এইচএসসিতে ৬৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ, মাদ্রাসা বোর্ডে ৯০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং কারিগরি বোর্ডে ৮৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। আট সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বোর্ডে, ৭৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম পাসের হার যশোর বোর্ডে, ৪৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এছাড়া ঢাকা বোর্ডে ৫৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, সিলেট বোর্ডে ৭৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ, দিনাজপুর বোর্ডে ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশ, বরিশাল বোর্ডে ৭০ দশমিক ০৬ শতাংশ, কুমিল্লা বোর্ডে ৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশ ও চট্টগ্রাম বোর্ডে ৬৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ পাস করেছে।
 
আটটি সাধারণ বোর্ড, মাদ্রাসা এবং কারিগরি বোর্ডের অধীনে ৮ হাজার ৩০৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ ৬১ হাজার ৬২৪ জন শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয়। এদের মধ্যে পাস করেছে ৭ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭২ জন। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৩৬৩ জন ছাত্র এবং ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৫০৯ জন ছাত্রী। 
 
আট শিক্ষা  বোর্ডের চিত্র
 
ঢাকা বোর্ড : পাসের হার ৫৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। ঢাকা বোর্ড থেকে এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬ জন। পাস করে  ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫৩ জন। এর মধ্যে ৯৮ হাজার ২৯ জন ছাত্র এবং ৯২ হাজার ৮২৪ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮ হাজার ৮৯৩ জন।
 
রাজশাহী বোর্ড: পাসের হার ৭৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ড থেকে এবার ১ লাখ ৪ হাজার ৮৮২ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করে ৮১ হাজার ৩৩০ জন। এর মধ্যে ৪২ হাজার ৫১৩ জন ছাত্র এবং ৩৮ হাজার ৮১৭ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ২৫০ জন।
 
চট্টগ্রাম বোর্ড : পাসের হার ৬৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়া ৮০ হাজার ৭০৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫১ হাজার ২৪৩ জন পাস করে। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৪২৫ জন ছাত্র এবং ২৬ হাজার ৮১৮ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ১২৯ জন।
 
কুমিল্লা বোর্ড: পাসের হার ৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। কুমিল্লা বোর্ড থেকে এবার ৯৯ হাজার ৯৬৬ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করে ৫৯ হাজার ৭৭৮ জন। এর মধ্যে ২৮ হাজার ৭৫৫ জন ছাত্র এবং ৩১ হাজার ২৩ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৪৫২ জন।
 
যশোর বোর্ড: পাসের হার ৪৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। যশোর বোর্ড থেকে এবার ১ লাখ ১৪ হাজার ২৮১জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। ৫৩ হাজার ৮৭ জন পাস করে। এর মধ্যে ২৭ হাজার ৫০ জন ছাত্র এবং ২৬ হাজার ৩৭ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৯২৭ জন।
 
বরিশাল বোর্ড: পাসের হার ৭০ দশমিক ০৬ শতাংশ। বরিশাল বোর্ডের অধীনে এবার ৫৫ হাজার ৮০৪ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করে ৩৯ হাজার ৯৭ জন। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৯৭৮ জন ছাত্র এবং ২০ হাজার ১১৯ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৩১৯ জন।
 
সিলেট বোর্ড: পাসের হার ৭৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সিলেট বোর্ডের অধীনে এবার ৫৭ হাজার ৭০২ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করে ৪৩ হাজার ২৮ জন। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৯ হাজার ৭২১ জন ছাত্র এবং ২৩ হাজার ৩০৭জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৩৫৬ জন।
 
দিনাজপুর বোর্ড: পাসের হার ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে এবার ৮৮ হাজার ৯৮৮ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করে ৬২ হাজার ৬৭১ জন। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩১ হাজার ৮২২ জন ছাত্র এবং ৩০ হাজার ৮৪৯ জন ছাত্রী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৩৯৫ জন।