২০০২ সালে এইচএসসিতে পাসের হার ছিল ২৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এরপর ধারাবাহিকভাবে পাসের হার বেড়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম বড় ধরনের ফল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটলো। এবার এইচএসসিতে আট শিক্ষাবোর্ডে (মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড ছাড়া) পাসের হার গত বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৯ ভাগ কমেছে। আর জিপিএ-৫ কমেছে প্রায় অর্ধেক।
সবচেয়ে বেশি খারাপ করেছে যশোর বোর্ড। এই বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর অর্ধেকের বেশিই ফেল করেছে। আর ঢাকা বোর্ডে পাসের হার গতবারের চেয়ে প্রায় ১৭ ভাগ কমেছে। গতবার এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৮৪ দশমিক ৫৪, এবার ৬৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। চট্টগ্রামে প্রায় ৭ শতাংশসহ সাধারণ ৮টি বোর্ডের সবকটিতেই পাসের হার কমেছে।
এইচএসসির ফলের এই ছন্দপতনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। এর পেছনে তারা ৬টি কারণ খুঁজে পেয়েছেন। এগুলো হলো: প্রশ্নের ধরন পরিবর্তন, অন্য বোর্ডের প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়া, প্রশ্ন ফাঁসের গুজব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নতুন বিষয় বাধ্যতামূলক করা এবং ইংরেজি ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে বেশি অকৃতকার্য হওয়া। তারা বলছেন, সরকারের উচিত এসব ব্যাপারে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া।
গতবছরের চেয়ে এবার ফল খারাপ হওয়ার কারণ হিসেবে বছরের শুরুতে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধকেই চিহ্নিত করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেছেন, বছরের শুরুতে স্কুলগুলোতে প্রস্তুতি ক্লাস নেয়া সম্ভব হয়নি। এতে শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছিল। হরতাল-অবরোধের কারণে শুক্র ও শনিবারে ক্লাস নিতে হয়েছে। এটার একটা প্রভাবতো আছেই। এটা একটা বড় কারণ, তবে একমাত্র কারণ নয়। আরেকটি বিষয় হল আমরা সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করেছি। আমাদের হয়তো অনেক ত্রুটি ও প্রস্তুতির অভাব রয়েছে।
ঢাকার একাধিক কলেজের শিক্ষকরা বলেছেন, গত বছর এইচএসসিতে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রশ্ন ফাঁস হবে এমন আশা নিয়ে ছিল। এ কারণে তারা পরীক্ষায় ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয়নি। ফলে পরীক্ষায় তারা ভালো করেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এবার ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ নামে একটি বিষয় আবশ্যিক করা হয়। এ বিষয়টিতে অনেক শিক্ষার্থী ফেল করেছে। এছাড়া সৃজনশীল পদ্ধতিতে এখনো অনেক শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাননি। শুধুমাত্র যারা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন ও খাতা মূল্যায়ন করেন তারাই প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। যেসব বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা হয়েছে, সেসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে প্রস্তুত করতে পারেননি।
তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং ইংরেজিতে, সিলেট শিক্ষাবোর্ডে যুক্তিবিদ্যা ও ইংরেজিতে, যশোরে ইংরেজিতে, চট্টগ্রাম বোর্ডে ইংরেজি, বাংলা ও পৌরনীতিতে শিক্ষার্থীরা বেশি খারাপ করেছে।
পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড চট্টগ্রামের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মাহবুব হাসান সাংবাদিকদের বলেন, আগে নিজ নিজ বোর্ড প্রশ্নপত্র তৈরি করতো। চলতি বছর থেকে নিজ বোর্ড বাদ দিয়ে বাকি ৭ বোর্ডের ২৮ সেট প্রশ্নপত্র থেকে যে কোনো চার সেট পছন্দ করা হয়েছে। আগে শিক্ষার্থীরা সিলেক্টিভ পদ্ধতি অনুসরণ করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিত। পুরো বই পড়তো না। এখন ভিন্ন একটি বোর্ডের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফলাফল ভালো করতে পারেনি।
যশোর বোর্ডে এবার পাস করেছে ৪৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এই বোর্ডে গতবার পাসের হার ছিল ৬০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। গতবারের চেয়ে এবার পাসের হার কমেছে ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। এই বোর্ডের পাসের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইংরেজিতে পাসের হার কমায় এই বোর্ডে পাসের হার কমেছে। এই বোর্ডে এবার ইংরেজিতে পাস করেছে ৫০ শতাংশ। এ ব্যাপারে যশোর শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মাধব চন্দ্র রুদ্র ইত্তেফাককে জানান, পরীক্ষার আগের দিন কথিত প্রশ্নপত্র নিয়ে শিক্ষার্থীরা চর্চা করে পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রকৃত প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিল পায়নি। এটাও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারও সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীল সম্পর্কে এখনো ভীতি রয়ে গেছে। এ ভীতি দূর না হলে পাসের হার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেয়া যাবে না।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. তোফাজ্জুর রহমান জানান, দুটি কারণে এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা কমেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সব শিক্ষা বোর্ডের কয়েকটি বিষয়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্র এবং অপরটি হচ্ছে গণিত পরীক্ষায় নতুন পদ্ধতি। তিনি বলেন, গণিতের প্রশ্নের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। এছাড়া গণিতসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন হয়েছে।
