প্রচলিত সমাজকাঠামোর অন্তঃশীলা প্রবাহে রয়েছে আপসকামিতা, অন্ধ আনুগত্য, শাস্ত্রবাদিতা, ব্যক্তিপরায়ণতা। হুমায়ুন আজাদ প্রজ্ঞায়-প্রকাশে-যাপিত জীবনে এই প্রচলিত কাঠামোর বাইরে নিজেকে স্থাপন করেছিলেন। তাঁর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দগদগে প্রকাশ ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’, ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’, এবং ‘বন্ধুরা আপনারা কি জানেন, আপনারা শোষণ উত্পাদন করছেন’ তিনটি কবিতা। তিনটি কবিতার শরীরময় শব্দ-চরণে গ্রথিত হয়েছে গভীরতর ব্যাধিগ্রস্ত সমাজছবি।
‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ কবিতায় রগরগে আক্ষেপ রয়েছে। কিন্তু তা শ্লোগানধর্মিতায় বিন্যস্ত নয়। কবিতার আবহ বজায় রেখে উপযোগী উপাদান আর অনুষঙ্গে কবির আক্ষেপ কবিতায় রূপ পেয়েছে। কবিতাটি ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা হিসেবে। যখন এ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গণমানুষের চিন্তাচেতনা তখন প্রতিফলিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। গণতন্ত্র নষ্টদের অধিকারে গেছে। যেহেতু প্রতিবাদের চেষ্টা গণমানুষের মধ্যে তীব্র ছিল না তাই তিনি ভেবেছেন, জনগণও নষ্টদের পক্ষেই যাবে। সমাজতন্ত্র গণমানুষের মুক্তির পথ। গণমানুষ নষ্টদের পক্ষে গেলে সমাজতন্ত্রও পথ হারাবে—এটাই স্বাভাবিক। হুমায়ুন আজাদ তাই বলেছেন—‘অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;/ চাষার সমস্ত স্বপ্ন আঁস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন/ সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।’ আজাদ এ কবিতায় তাঁর সমকালীন সামান্য প্রতিকূল পরিস্থিতি টেনে এনে যে ভবিতব্যের কথা বলেছেন তা আজ আক্ষরিক অর্থেই সত্যি হয়েছে। কবিতার শুরুতেই তিনি বলেছেন—‘আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।/ নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক/ সব সংঘ পরিষদ;— চ’লে যাবে অত্যন্ত উল্লাসে/ চ’লে যাবে এই সমাজ সভ্যতা— সমস্ত দলিল—’। তার কবিতা রচনার তিন দশকের মধ্যে নষ্ট মানুষের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এ দেশ। পাকিস্তান শাসনামলে শোষণ নিপীড়নের কালে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে শিল্পী-সাহিত্যিক-রাজনীতিকদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার বিস্তার ঘটেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই সেই দীপ্তিমান সড়কগুলো ক্রমশ অন্ধকার গলির দিকে এগিয়ে গেছে।
উল্লিখিত কবিতা গ্রন্থাকারে প্রকাশের ৫ বছর পর প্রকাশিত হয় ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’। শিরোনামটি কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা। ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ কবিতায় যে আক্ষেপ ঝরে পড়েছে, তা যেন গলিত পথে হতাশায় রূপ নিয়েছে ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’ কবিতায়। যখন সমাজ-রাষ্ট্রের প্রচলিত রীতি-প্রথার সাথে কোথাও কারও কোনো বিরোধ উচ্চকিত নয়, যখন অসংখ্য অসংলগ্নতাকেই মানুষ বরণ করছে, নিজস্ব পরিচয় ভুলে অনুকরণশীল জাতিতে পরিণত হচ্ছে তখন হুমায়ুন আজাদ নিজের অবস্থার সাথে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার সম্পর্ক নিরুপণ করেছেন নিজেকেই ভুল সময়ের মানুষ আখ্যা দিয়ে।
আমাদের সমাজে ব্যক্তিবিকাশের পথ অবরুদ্ধ। আরোপিত রীতি-প্রথার মধ্যে যদি কেউ বিকশিত হতে চায়, সমাজ তার জন্য উদার। হুমায়ুন আজাদ স্বভাবগতভাবেই যেহেতু স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী তাই তাঁকে সমাজ বরণ করতে চায়নি। প্রচলিত সমাজ কেমন তা তিনি কবিতায় রূপ দিয়েছেন—‘ওরা মুখে এক টুকরো বাসি মাংস পাওয়াকে ভাবতো সাফল্য,/ ওরা নতজানু হওয়াকে ভাবতো গৌরব,/ ওরা পিঠের কুঁজকে মনে করতো পদক,/ ওরা গলার শেকলকে মনে করতো অমূল্য অলংকার।’
হুমায়ুন আজাদ এর কোনোটাই হতে চাননি বলে তিনি ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়েছেন নিজস্ব দর্শনে। প্রতীকী ব্যঞ্জনায় তিনি কবিতায় ব্যক্ত করেছেন নিজের বারংবার চেষ্টার কথা। কবিতায় নিত্যজীবনের বিবিধ অনুষঙ্গ কবিতার উপাদান করেছেন এবং বারবার উচ্চারণ করেছেন—‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’।
‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ কবিতার মধ্যে জমাটবাঁধা ক্ষোভ-আক্ষেপ আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে কবিতায় এসে কিছুটা হতাশার রূপ পরিগ্রহ করেছে। ‘বন্ধুরা আপনারা কি জানেন, আপনারা শোষণ উত্পাদন করছেন’ কবিতায় এসে সেই বোধ বদলেছে কিছুটা। নষ্টদের অধিকারে তলিয়ে যাওয়া সমাজকে উদ্ধারের চেষ্টায় এবং অন্যদের সময়ে বেঁচে থাকার পরিবর্তে সময়কে বদলানোর প্রত্যয়ে তিনি লিখেছেন ‘বন্ধুরা আপনারা কি জানেন, আপনারা শোষণ উত্পাদন করছেন’ কবিতাটি। রাষ্ট্রযন্ত্র পুঁজিবাদের পক্ষে। শ্রেণিবৈষম্যপূর্ণ সমাজ রাষ্ট্রেরই সৃষ্টি। শ্রমিকসমাজ শ্রম বিনিয়োগ করে আর মালিকশ্রেণির ধনতন্ত্রের শেকড় আরও দৃঢ় হয়। সেজন্য হুমায়ুন আজাদ পোশাক কারখানার শ্রমিকদের উদ্দেশে এ কবিতাটি লিখেছেন। হুমায়ুন আজাদ যে স্বকীয়তায় বেড়ে উঠতে চেয়েছেন, যে সমাজ তাঁর কাম্য এ কবিতায় তার সামগ্রিক ছবি নেই। তবে শ্রেণিবৈষম্যপূর্ণ সমাজের বিরুদ্ধে শ্রমিকসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য এটি একটি উল্লখযোগ্য কবিতা। কবি লিখেছেন—‘আপনাদের ঘামে যখন তৈরি হয় একটি সূতোর তন্তু/ তখন পুঁজিপতির ঝকঝকে টেবিলে আসে এক ক্যান ঠাণ্ডা বিয়ার।’ শ্রমিকের ঘামে-রক্তে বিত্তশালীদের বিলাসী জীবন আরও বিস্তৃত হতে থাকে। হুমায়ুন আজাদ তাই কলকারখানার সুইচ বন্ধ করার সাথে সাথে শোষণ বন্ধ হওয়ার কথা বলেছেন।
হুমায়ুন আজাদ আমৃত্যু স্বকীয় দর্শনে অবিচল ছিলেন। নিজের মত প্রকাশে তিনি কোনো কুণ্ঠিত ছিলেন না। তাঁর বক্তব্য, তাঁর সৃষ্টিসম্ভার সর্বত্রই তিনি ছিলেন লক্ষ্যভেদী। রক্ষণশীল মানুষের কাছে তাঁর মূল্যায়ন নেতিবাচক হলেও চিরায়ত বোধের কাছে তিনি অমূল্য বলেই পরিগণিত। ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’, ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’, এবং ‘বন্ধুরা আপনারা কি জানেন আপনারা শোষণ উত্পাদন করছেন’ কবিতা তিনটি তারই স্মারক।
